একাত্তরের এই দিনে: যুদ্ধের ভেতরেই রাষ্ট্র—মুজিবনগর সরকারের ঐতিহাসিক তাৎপর্য
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঐতিহাসিক ১০ এপ্রিল—বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার, যা পরে ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে পরিচিতি পায়। কেবল একটি সরকার গঠনই নয়, এই দিনটি ছিল যুদ্ধরত একটি জাতির রাষ্ট্রীয় কাঠামো দাঁড় করানোর দিন।
এর আগে, ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত হামলা কার্যত বাঙালির স্বাধীনতার পথকে অনিবার্য করে তোলে। ২৬ মার্চ রাত সাড়ে ১২টার দিকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে পাঠানো সেই বার্তায় ছিল স্পষ্ট উচ্চারণ—“আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।”
কিন্তু ঘোষণার পরপরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানি বাহিনী। নেতৃত্বশূন্যতার আশঙ্কা তৈরি হলেও বাস্তবে ঠিক উল্টোটা ঘটে—রাজনৈতিক নেতৃত্ব দ্রুত সংগঠিত হয়ে যুদ্ধকে একটি কাঠামোবদ্ধ রূপ দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে ১০ এপ্রিল, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিরা আনুষ্ঠানিকভাবে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন।
একইসঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুমোদনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ একটি আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি পায়। এর ফলে যুদ্ধটি কেবল বিদ্রোহ নয়, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বৈধ লড়াই হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
সরকার গঠনের পর ১১ এপ্রিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাজউদ্দিন আহমদের ভাষণ মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক রূপরেখা স্পষ্ট করে। তিনি দেশজুড়ে প্রতিরোধ যুদ্ধের চিত্র তুলে ধরেন এবং সংগঠিত লড়াইয়ের আহ্বান জানান। একইসঙ্গে ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
পরবর্তীতে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় ১৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত শপথ গ্রহণ ছিল এক প্রতীকী ও কৌশলগত পদক্ষেপ। শপথ শেষে তাজউদ্দিন আহমদ এ স্থানের নাম দেন ‘মুজিবনগর’। এর মাধ্যমে অনুপস্থিত বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে সামনে রেখে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।
১৮ এপ্রিল মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে দপ্তর বণ্টনের মাধ্যমে সরকার কার্যকরভাবে কাজ শুরু করে। মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান—যারা প্রশাসনিক, কূটনৈতিক ও যুদ্ধকালীন ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
মুজিবনগর সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে একটি সমন্বিত মুক্তিযুদ্ধে রূপ দেওয়া। মুক্তিবাহিনীর সংগঠন, যুদ্ধ পরিচালনা, শরণার্থী সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে এই সরকারের ভূমিকা ছিল নির্ধারক।
ফলে ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। সেই বিজয়ের পেছনে মুজিবনগর সরকারের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও নেতৃত্ব ছিল অন্যতম ভিত্তি।
১০ এপ্রিল তাই শুধু একটি তারিখ নয়—এটি প্রমাণ করে, একটি জাতি যখন অস্তিত্বের লড়াইয়ে নামে, তখন যুদ্ধের মাঝেই রাষ্ট্র গড়ে তোলার সক্ষমতাও অর্জন করে।
