গত ৪ মার্চ সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে এক দীর্ঘ পোস্টে দাবি করেছিলেন, “আমি সরকারে থাকা অবস্থায় বা এর আগে-পরে জীবনে কখনো এক টাকাও দুর্নীতি করিনি।” তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ ‘দুর্নীতিমুক্ত’ দাবি করে জাতির সামনে যে সাধু সাজার চেষ্টা করেছেন, তার নেপথ্যের অন্ধকার চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ। বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাঁর দেড় বছরের শাসনামলে সংঘটিত সীমাহীন অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য এবং বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ার রোমহর্ষক তথ্য।
১. সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে শতকোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য
আসিফ নজরুলের ১৮ মাসের রাজত্বে সবচেয়ে বড় দুর্নীতির ক্ষেত্র ছিল সাব-রেজিস্ট্রার বদলি। আইন মন্ত্রণালয়ে কোনো নীতিমালা না মেনেই ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনকে ঢালাওভাবে বদলি করা হয়।
ঘুষের হার: ভালো স্টেশনে বদলির জন্য জনপ্রতি ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত এবং সাধারণ বদলিতে ৫০-৬০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।
নীতিমালা লঙ্ঘন: ‘সি’ গ্রেডের কর্মকর্তাদের ‘এ’ গ্রেডের লাভজনক অফিসে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে শুধু টাকার বিনিময়ে।
সিন্ডিকেট: এই বাণিজ্য সামাল দিত তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) সামসুদ্দিন মাসুমের নেতৃত্বাধীন একটি চক্র। মাসুম ছিলেন তাঁর ‘ক্যাশিয়ার’।
২. বিচারক বদলিতে নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ
২০২৪ সালের জুনে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ ছাড়াই একযোগে ২৫২ জন বিচারককে বদলি করা হয়। এটি ছিল বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই গণ-বদলির পেছনে ছিল আসিফ নজরুলের শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট, যারা বিচারকদের কাছ থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
৩. জামিন বাণিজ্য ও প্রভাবশালী আসামিদের রেহাই
আসিফ নজরুলের হস্তক্ষেপে অর্থের বিনিময়ে বহু হাই-প্রোফাইল আসামির জামিন নিশ্চিত করা হয়েছে।
ট্রান্সকম মামলা: শেয়ার জালিয়াতি ও ভাই হত্যার মামলায় ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন হোসেনকে একদিনে তিনটি মামলায় নজিরবিহীনভাবে জামিন দেওয়া হয়।
গান বাংলার তাপস: টাকার বিনিময়ে কেবল জামিনই নয়, তাপসকে বিদেশে যাওয়ার সুযোগও করে দেওয়া হয়। এছাড়া বহু ব্যবসায়ী ও সাবেক আমলাদের কাছ থেকে কয়েকশ কোটি টাকা নিয়ে জামিনের ব্যবস্থা করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
৪. ডিসি নিয়োগ ও সচিব পদায়নে কমিশন
অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে আসিফ নজরুল জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগের তদন্ত কমিটিতে একক কর্তৃত্ব বজায় রাখেন। সাবেক জনপ্রশাসন সচিব মোখলেসুর রহমানের সঙ্গে যোগসাজশ করে তিনি নিজের পছন্দের প্রার্থীদের ডিসি হিসেবে পদায়ন করেন। এছাড়া, ১০ কোটি টাকার বিনিময়ে আইন সচিব হিসেবে গোলাম সারোয়ারকে রেখে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
৫. রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্সে ‘লাইসেন্স টু করাপশন’
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকাকালীন আসিফ নজরুল নতুন করে ২৫২টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স অনুমোদন দেন।
উপার্জন: প্রতিটি লাইসেন্স থেকে ১ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।
অস্বাভাবিকতা: যেখানে ভারতে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ২ হাজারের কম, সেখানে বাংলাদেশে তা ২ হাজার ৬০০ ছাড়িয়েছে। শ্বেতপত্র কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করে তিনি এই লাইসেন্স বাণিজ্য চালিয়ে গেছেন।
৬. বেনামে বিপুল সম্পদ ও ‘সন্তানের নামে’ বাড়ি
নিজেকে সম্পদহীন দাবি করলেও আসিফ নজরুলের আত্মীয়স্বজনের সম্পদ গত দেড় বছরে কয়েক গুণ বেড়েছে।
ইস্কাটনের বাড়ি: নিউ ইস্কাটনের মতো অভিজাত এলাকায় তাঁর এক ১৬-১৭ বছর বয়সী ছাত্রীর (যিনি তাঁর সাবেক স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান) নামে একটি বিলাসবহুল বাড়ি কেনা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, একজন কিশোরী এত টাকা কোথায় পেল?
কৌশল: অধিকাংশ দুর্নীতির অর্থ তিনি তাঁর দূর সম্পর্কের আত্মীয়দের নামে বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সম্পদে রূপান্তর করেছেন যাতে আইনি জটিলতা এড়ানো যায়।
আসিফ নজরুল ফেসবুকে নিজেকে ‘সাধু’ দাবি করলেও নথিপত্র এবং ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য বলছে ভিন্ন কথা। সততার মুখোশ পরে তিনি মূলত সরকারি দপ্তরগুলোকে ঘুষের হাটে পরিণত করেছিলেন। এই ‘মহাদুর্নীতিবাজের’ বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
