অদিতি করিম
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনকাল শেষ হওয়ার পর এখন সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের এক আলোচনা সভায় সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ দাবি করেন, দায়িত্ব পালনের শুরুর দিকে ‘ডিপ স্টেট’ বা রাষ্ট্রের অদৃশ্য প্রভাবশালী কিছু গোষ্ঠী তাঁদের ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার প্রস্তাব দিয়েছিল। বিনিময়ে শেখ হাসিনার মেয়াদের বাকি সময় পূর্ণ করতে এবং নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।
কী এই ‘ডিপ স্টেট’ বিতর্ক? আসিফ মাহমুদের ভাষ্যমতে, একটি শক্তিশালী অদৃশ্য শক্তি বা ‘ডিপ স্টেট’ চেয়েছিল আদালতকে ব্যবহার করে বিএনপি নেতাদের সাজা বহাল রাখতে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় নির্বাচন পিছিয়ে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে দীর্ঘস্থায়ী করতে। যদিও আসিফ মাহমুদ দাবি করেছেন তাঁরা সেই প্রস্তাব নাকচ করে গণতন্ত্রের স্বার্থে নির্বাচনে গিয়েছেন, কিন্তু বিশ্লেষকরা এই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার অমিল খুঁজে পাচ্ছেন। সরকারের প্রথম ১০ মাসের কর্মকাণ্ডে ‘নির্বাচনবিমুখতা’ এবং ‘আগে সংস্কার পরে নির্বাচন’ স্লোগানটি মূলত ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করারই কৌশল ছিল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড় ও বিতর্কিত অধ্যাদেশ ইউনূস সরকারের বিদায়ের পর উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন ছাড়া প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। অভিযোগ উঠেছে, বেশ কিছু অধ্যাদেশ জনস্বার্থে নয়, বরং নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ‘ডিপ স্টেটের’ এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জারি করা হয়েছিল।
মার্কিন চুক্তি ও থিঙ্কট্যাংকগুলোর সমালোচনা সরকারের বিদায়ের ঠিক আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা কিছু গোপন ও প্রকাশ্য চুক্তি নিয়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। টিআইবি ও সিপিডির মতো সংস্থাগুলো এখন এই চুক্তিকে ‘দেশস্বার্থ বিরোধী’ বলে অভিহিত করছে। বিশেষ করে সেন্ট মার্টিনে পর্যটন নিয়ন্ত্রণ, চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা দেওয়া এবং মার্কিন প্রভাবাধীন আইএমএফ-এর প্রেসক্রিপশনে ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের নামে সংকট তৈরির পেছনে ‘ডিপ স্টেটের’ নীল নকশা ছিল কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
আসিফ মাহমুদ ও নাহিদ ইসলামের অভিন্ন সুর আসিফ মাহমুদের আগে এনসিপি’র আহ্বায়ক ও সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামও ‘ডিপ স্টেট’ প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পেছনেও তিনি এই অদৃশ্য শক্তির হাত থাকার ইঙ্গিত দেন। দুই ছাত্র উপদেষ্টার এই অভিন্ন সুর প্রমাণ করে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ড. ইউনূসের পাশাপাশি এই অদৃশ্য শক্তির একটি গভীর যোগসূত্র ছিল।
বর্তমানে বিশেষ সংসদীয় কমিটি এবং বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে এই সরকারের আমলের অর্থনৈতিক অনিয়ম এবং ‘ডিপ স্টেটের’ এজেন্ডাগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ড. ইউনূসের ইমেজ এখন ইতিহাসের কাঠগড়ায়, যেখানে দেড় বছরের শাসনকালের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে চলছে কঠোর ব্যবচ্ছেদ।
