১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণার পর বিশ্ব গণমাধ্যম যেভাবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে প্রত্যক্ষ করেছিল, তা ছিল এক অভূতপূর্ব অধ্যায়।
কেননা, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার ঘটনাটি কেবল উপমহাদেশের রাজনীতিতেই নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তৎকালীন বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর প্রধান সংবাদপত্রগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই সংবাদ পরিবেশন করে, যা পরবর্তী নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে সহায়ক হয়েছিল।
১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম: নিউইয়র্ক টাইমস
মার্কিন গণমাধ্যম ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ ২৭ মার্চ ১৯৭১ সংখ্যার শিরোনামে লিখেছিল— “লিডার অব রেবেল ইন ইস্ট পাকিস্তান রিপোর্টেড সিজড” (পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্রোহী নেতাকে আটক করা হয়েছে)। যদিও তারা গ্রেপ্তারের খবরকে বড় করে দেখিয়েছিল, কিন্তু ভেতরের খবরে পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়া এবং স্বাধীনতার আকুলতার কথা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল।
২. লাতিন আমেরিকার কণ্ঠস্বর: বুয়েন্স আয়ার্স হেরাল্ড
আর্জেন্টিনার সংবাদপত্র ‘বুয়েন্স আয়ার্স হেরাল্ড’ ২৭ মার্চের সংখ্যায় বড় শিরোনাম করেছিল— “বেঙ্গলি ইন্ডিপেন্ডেন্স ডিক্লেয়ারড বাই মুজিব” (মুজিব কর্তৃক বাঙালির স্বাধীনতা ঘোষণা)। এই প্রতিবেদনটি প্রমাণ করে যে, স্বাধীনতার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার খবর পৌঁছে গিয়েছিল।
৩. ইউরোপীয় সংবাদপত্রের প্রতিক্রিয়া: ইতালি, নরওয়ে ও নেদারল্যান্ডস
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সংবাদপত্রগুলো বঙ্গবন্ধুর এই সাহসিকতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে:
- লা স্টেম্পা (ইতালি): ইতালির এই পত্রিকাটি ২৭ মার্চ সংবাদ দেয়— “পূর্ব পাকিস্তান তার স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং সেখানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে।”
- আফটেনপোস্টেন (নরওয়ে): নরওয়ের প্রভাবশালী এই পত্রিকাটি শিরোনাম করে— “পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন ঘোষিত; খান কর্তৃক মুজিবুর বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত।” তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের কঠোর অবস্থানের বিপরীতে বাঙালির স্বাধীনতার লড়াই যে বিশ্বজুড়ে জানাজানি হয়েছিল, এটি তার বড় প্রমাণ।
- লিউওয়ার্ডার কোরান্ট (নেদারল্যান্ডস): নেদারল্যান্ডসের পত্রিকাটি বঙ্গবন্ধুর ছবিসহ সংবাদ ছাপে— “মুজিবুর পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।”
৪. এশীয় গণমাধ্যম: জাপান ও থাইল্যান্ড
এশিয়ার দেশগুলোতেও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের খবর ছিল অত্যন্ত সরব:
- আসাহি ইভনিং নিউজ (জাপান): জাপানের এই প্রধান সংবাদপত্রটি ২৭ মার্চ সংবাদ দেয়— “পৃথিবী বিচ্ছিন্ন পূর্ব পাকিস্তান: শহরে ব্যাপক সংঘর্ষ, আত্মগোপনে শেখ মুজিব।” তারা মূলত যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং স্বাধীনতার সংকল্পের কথা তুলে ধরে।
- দ্য ব্যাংকক পোস্ট (থাইল্যান্ড): থাইল্যান্ডের এই পত্রিকাটি শিরোনাম করে— “পাক নিয়ার সিভিল ওয়ার: ইস্ট ডিক্লেয়ারস ইন্ডিপেন্ডেন্স” (পাকিস্তান গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে: পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা)।
৫. অস্ট্রিয়া ও মধ্য ইউরোপের গণমাধ্যম
অস্ট্রিয়ার সংবাদপত্র ‘আর্বিটার জিটাং’ শিরোনাম করেছিল— “অফেনার ব্যুরগারক্রিগ ইন পাকিস্তান” (পাকিস্তানে প্রকাশ্য গৃহযুদ্ধ)। তারা লিখেছিল, দাক্কা (ঢাকা) থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক এসেছে এবং লড়াই চলছে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে।
১৯৭১ সালের ২৬ ও ২৭ মার্চ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই সংবাদগুলো ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের জন্ম অনিবার্য। বঙ্গবন্ধুর সেই একটি ঘোষণার মাধ্যমেই বিশ্ব গণমাধ্যম বুঝতে পেরেছিল যে, বাঙালি আর পাকিস্তানের শোষণে থাকতে রাজি নয়। আন্তর্জাতিক এই শিরোনামগুলো আজও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে সংরক্ষিত।
