নিজস্ব প্রতিনিধ
দীর্ঘ প্রায় আড়াই দশক পর সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বৃহস্পতিবার সকালে দলটির আমির ও বর্তমান সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে শীর্ষ নেতারা স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রীয় আচারের অংশ হিসেবে আমরা জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানিয়েছি। তবে দীর্ঘ সময় পর তাদের এই উপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এর আগে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী হিসেবে মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ স্মৃতিসৌধে গিয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘ সময় জামায়াত নেতারা স্মৃতিসৌধ বিমুখ ছিলেন। মাঝের বছরগুলোতে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি বা স্বাধীনতার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দোহাই দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যেতেন।
প্রায় ২৫ বছর পর জামায়াতের এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নিছক ‘শ্রদ্ধা’ হিসেবে দেখছেন না। লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, এটি জামায়াতের মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে আসার একটি কৌশল। তিনি বলেন, ঘোষণা দিয়ে ক্ষমা না চাইলেও জামায়াত একাত্তরের ইমেজ থেকে বের হয়ে আসতে চায়। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন থেকেই তারা এই চেষ্টা করছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় সব নেতার ফাঁসি বা কারাদণ্ড হয়েছে। বর্তমান নেতৃত্বে থাকা অনেক নেতা একাত্তর-পরবর্তী প্রজন্মের হলেও, তারা দণ্ডপ্রাপ্ত নেতাদের এখনো ‘শহীদ’ হিসেবে গণ্য করেন। যদিও একাত্তরের ভূমিকার জন্য দলটি এখনো আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চায়নি। তবুও এবার স্মৃতিসৌধে যাওয়াকে অনেকে ‘দায় স্বীকারের’ প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখছেন।
তবে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ একে ‘পেছনে ফিরে না তাকিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার’ প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
জামায়াতের এই সফরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া গেছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান মন্তব্য করেছেন যে, জামায়াত সম্মান জানালেও তাদের অতীতের অবস্থান এখনো পরিষ্কার করেনি।
সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স কড়া সমালোচনা করে বলেন, তারা রাষ্ট্রীয় আচারের দোহাই দিচ্ছে, যার অর্থ তারা এখনো মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদদের মনে-প্রাণে স্বীকার করে না।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন একে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও জামায়াতকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের মতো নেতাদের জয়লাভ এবং বিরোধী দলীয় নেতার মর্যাদায় ডা. শফিকুর রহমানের স্মৃতিসৌধ সফর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জামায়াত কি সত্যিই তাদের একাত্তরের অবস্থান থেকে সরে আসছে, নাকি এটি কেবলই ক্ষমতার রাজনীতির একটি অংশ সেই প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
