নিজস্ব প্রতিনিধি
১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়দেবপুরের মাটিতে জ্বলে উঠেছিল প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের অগ্নিশিখা। সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিকে অম্লান রাখতে নির্মিত হয়েছিল ‘সশস্ত্র প্রতিরোধ’ ভাস্কর্য। কিন্তু আজ সেই গর্বের স্মারকটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে পড়ে আছে অবহেলা আর আবর্জনার স্তূপের নিচে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় সচেতন মহলে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (LGED) প্রায় ১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে জয়দেবপুর রেললাইনের পশ্চিম পাশে নির্মিত হয়েছিল ১৩ ফুট উচ্চতার এই ভাস্কর্যটি। ভাস্কর কুয়াশা বিন্দুর নিপুণ ছোঁয়ায় এতে ফুটে উঠেছিল লাঠি, কাস্তে আর একনলা বন্দুক হাতে কৃষক-শ্রমিক ও সাধারণ জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধের ছবি। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় একদল উচ্ছৃঙ্খল জনতা ভাস্কর্যটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। নয়টি প্রতীতি ভাস্কর্যের প্রত্যেকটির হাঁটু পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হয় এবং সেখানে আগুন জ্বালিয়ে উল্লাস করা হয়।
যে স্থানে ইতিহাসের বীরত্বগাথা ডানা মেলার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধুই বিশৃঙ্খলা। ভাস্কর্যের ভাঙা অংশগুলো ঢেকে গেছে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ব্যানার ও ফেস্টুনে। সামনের জায়গাটুকু দখল করে বসেছে ফল ও সবজির দোকান। নিচে কাঁচা বাজারের ময়লা-আবর্জনার স্তূপ পচছে। ভাস্কর্যটি যে অবস্থায় আছে, তা দেখে বোঝার উপায় নেই এটি ছিল বাঙালির প্রথম সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতীক।
ভাস্কর্যটির নির্মাতা ভাস্কর কুয়াশা বিন্দু অত্যন্ত ব্যথিত কণ্ঠে সাংবাদিকদের বলেন, দীর্ঘ পরিশ্রম ও সাধনায় এটি তৈরি করেছিলাম। মুহূর্তের মধ্যে সেটি ভেঙে ফেলার দৃশ্য দেখে আমি আজও স্বাভাবিক হতে পারিনি।
গাজীপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম জানান, তারা পুনরায় ভাস্কর্যটি নির্মাণের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সারাদেশে এক ধরনের ‘মব ভায়োলেন্স’-এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করা হয়। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির প্রচ্ছন্ন ইশারায় এসব ভাঙচুর চালানো হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। তবে দেশবাসী আশা করেছিল, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযুদ্ধের এই গৌরবময় স্মারকগুলো সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সন্তান এবং দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উত্তরাধিকারী হিসেবে তার সরকার কি এই ধ্বংসপ্রাপ্ত ভাস্কর্যটি সংস্কারে কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেবে? নাকি জয়দেবপুরের সেই বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস এভাবেই অবহেলায় হারিয়ে যাবে—এখন এটিই গাজীপুরবাসীর বড় প্রশ্ন।
