নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প এখন অনিশ্চয়তার মুখে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেওয়া এই বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পটি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কার্যত থমকে যায়। ফলে ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও প্রকল্পটি নিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না নতুন সরকারও। এতে রাজধানীর বিমানবন্দর–কমলাপুর ও নদ্দা–পূর্বাচল রুটে নির্মাণাধীন পাতাল মেট্রোরেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২২ সালে কাজ শুরুর পরও এখন পর্যন্ত নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি করতে পারেনি ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। বরং যেসব প্যাকেজে দরপত্র শেষে চুক্তি হয়েছিল, সেগুলোর কাজও বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার অর্থায়নে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। ২০১৮–১৯ সালে ধারণামূলক নকশার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা।
তবে পরবর্তী সময়ে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা মূল ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৮৫ শতাংশ বেশি। অন্যান্য মেট্রো প্রকল্পের তুলনায় পাতাল অংশে ব্যয় বৃদ্ধির ধাক্কা সবচেয়ে বেশি পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, “ঢাকায় মেট্রো রেলের কাজ অনেক কারণে থেমে গিয়েছিল। সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মেট্রো রেলের কাজ পুনরায় শুরু হয়েছে।”
তবে বাস্তবে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্যাকেজ এখনো অচল অবস্থায় রয়েছে। মেট্রো পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ ব্যয় বৃদ্ধির জন্য জাপানি কোম্পানি ও জাইকার শর্তকে দায়ী করেছেন।
তিনি বলেন, “কাজ থেমে আছে বিষয়টা এমন নয়, কাজ চলছে। দরপত্রগুলো যাচাই করে দেখা হয়েছে। আমাদের কাছে মনে হয়েছিল দর বেশি হয়েছে। তাই চুক্তি বাতিলের জন্য চিঠি দিয়েছিলাম। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। জাইকা পাল্টা চিঠি দিয়ে ব্যয়ের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে।”
অন্যদিকে প্রকল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন—এসব কারণে প্রকল্প ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এদিকে জাইকার শর্তের কারণে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে মেট্রো কর্তৃপক্ষ। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্ডারগ্রাউন্ড প্যাকেজে জাপানি কোম্পানির উপস্থিতি বেশি থাকলেও ডিপো ও এলিভেটেড অংশে অন্যান্য দেশের প্রতিষ্ঠানও অংশ নিয়েছে। সেসব প্যাকেজেও ব্যয় ডিপিপির তুলনায় বেশি হয়েছে।
মেট্রোর কাজ এগোতে না পারায় ২০২৫ সালের মে মাসের পর থেকে চুক্তির শেষ পর্যায়ে থাকা সিপি–২, সিপি–৫ এবং প্রি-কন্ট্রাক্ট নেগোসিয়েশন শেষ হওয়া সিপি–৬ প্যাকেজসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। একই সঙ্গে প্রকল্পের পরামর্শক দলের কাজও বন্ধ রাখা হয়েছে।
জানা গেছে, এ কারণে বাংলাদেশে অবস্থানরত ছয় থেকে সাতটি জাপানি কোম্পানি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। টেন্ডার বন্ড বাবদ ব্যাংক সুদ, অফিস পরিচালনা ব্যয় ও জনবল খরচ মিলিয়ে কয়েক মাস ধরে বড় অঙ্কের আর্থিক চাপ বহন করছে তারা।
এ সময় ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত প্রকল্পটি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠিও দিয়েছেন। তবে তাতেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। উল্টো পরবর্তীতে এসব প্যাকেজ বাতিলের বিষয়ে জাইকার কাছে চিঠি পাঠানো হলেও প্রয়োজনীয় যুক্তি না থাকায় তা গ্রহণ করেনি সংস্থাটি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্প ব্যয় আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি জাপান–বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদারিত্বেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে, প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের আড়ালে এটি বাতিল বা পুনঃদরপত্রের দিকে নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। যদিও সরকারিভাবে এখনো এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
