দেশে মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনির ঘটনা ক্রমেই উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষ মব সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। মানবাধিকার সংগঠন ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৮ মাসে মব সন্ত্রাসে নিহত হয়েছেন অন্তত ৩০৮ জন।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর সদরঘাট এলাকায় গত ৩১ অক্টোবর মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হন বিআইডব্লিউটির ইলেকট্রিশিয়ান আনোয়ার হোসেন বাবু। তার মা দিলরুবা আক্তার অভিযোগ করেন, নিরপরাধ ছেলেকে রাস্তা থেকে ধরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তেও পুলিশ জানতে পেরেছে, নিহত আনোয়ার কোনো চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। ঘটনার পর মামলা হলেও বেশিরভাগ অভিযুক্ত এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
এদিকে পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজারে একটি রেস্টুরেন্টে এক ক্রেতাকে ঘিরে ধরে মারধরের ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসে নিহত হন ১২৮ জন। এর মধ্যে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর—এই পাঁচ মাসেই মারা যান ৯৬ জন। ২০২৫ সালে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯৮ জনে এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে আরও ১৪ জন নিহত হন।
এছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ২১১টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৪৮৭টি বাড়িঘরে হামলা, ৮৮টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং ১১৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটে। একই সময়ে ৪৭টি মন্দির ও মঠ এবং ১৯৪টি প্রতিমার ওপর হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে টার্গেট করে গণপিটুনির ঘটনা ঘটানো হয়।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে বা উসকানির মাধ্যমে মব সহিংসতা বাড়ছে। পাশাপাশি পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিও এ ধরনের ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশে মব কালচার বন্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
অন্যদিকে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল ইফতেখার আহমেদ বলেন, মব সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, মব সহিংসতা ঠেকাতে দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
