অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। ক্ষমতায় থাকার সময় ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করে অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগে ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) শত শত লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, জুলাই আন্দোলনের পর ছাত্র-জনতার প্রত্যাশা নিয়ে যাদের হাতে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছিল, তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই এখন গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন সংস্থা ইতোমধ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসসহ প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই অভিযোগ জমা পড়েছে। দায়িত্ব ছাড়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই এসব অভিযোগ জমা হয় বলে জানা গেছে।
এদিকে অর্থ পাচার ও মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সংস্থাটি সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ফাওজুল কবির খান, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরীর ব্যাংক হিসাব তলব করেছে। তাদের ব্যাংক হিসাব থেকে অস্বাভাবিক কোনো লেনদেন হয়েছে কি না তা যাচাই করা হচ্ছে।
দুর্নীতির সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও যুব-ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তার একান্ত সহকারী (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এত বেশি ছিল যে দায়িত্বে থাকা অবস্থাতেই তাকে বরখাস্ত করতে হয়। বর্তমানে ওই অভিযোগগুলোরও তদন্ত করছে দুদক।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর নথি অনুযায়ী, মোয়াজ্জেম হোসেনের গাড়িচালকের ভাই ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তার আয়কর রিটার্নে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য দিয়েছেন, যা তার আয়ের উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অভিযোগ রয়েছে, আসিফ মাহমুদ প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো এবং নিজের এলাকায় অযৌক্তিক প্রকল্প অনুমোদনের ব্যবস্থা করেছিলেন। উপজেলা পর্যায়ে মিনি-স্টেডিয়াম নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
তার সুপারিশে নিয়োগ পাওয়া ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন–এর সাবেক প্রশাসক এজাজের বিরুদ্ধেও তহবিল তছরুফসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যা তদন্ত করছে দুদক। একই সঙ্গে ডিএনসিসি নিজেও বিষয়টি তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আরেক ছাত্র উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের একান্ত সচিব আতিক মোর্শেদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রভাব খাটিয়ে তার স্ত্রীর মাধ্যমে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’-এ নিয়োগ অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
এছাড়া টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে আরেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে। দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধেও।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ–এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে দুর্নীতির তথ্য আমলযোগ্য হলে অবশ্যই তা তদন্ত করা প্রয়োজন এবং কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
