মাত্র দেড় বছর আগেও রাজস্ব আদায়ে নতুন নতুন রেকর্ড গড়েছিল ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চে এসে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো—কোষাগার প্রায় শূন্য, নিয়মিত বেতন-ভাতা দিতেই হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায় বিশেষ বরাদ্দ চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছে দুই সিটি কর্পোরেশন।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) রাজস্ব আদায় করে ১ হাজার ৬১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) আদায় করে ১ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। এ দুই প্রতিষ্ঠানই তখন রাজস্ব সংগ্রহে ইতিহাস গড়ে।
কিন্তু মাত্র ১৮–২০ মাসের ব্যবধানে চিত্র পাল্টে গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিএসসিসির রাজস্ব নেমে আসে মাত্র ৭৯১ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৭০ কোটি টাকা কম। একইভাবে ডিএনসিসির ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা, তবে বাস্তবে আদায় হয়েছে অনেক কম।
পূর্ববর্তী বছরগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএনসিসির রাজস্ব ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ৬১২ কোটি টাকা, যা ২০২০-২১-এ বেড়ে ৬৯২ কোটি, ২০২১-২২-এ ৭৯৪ কোটি, ২০২২-২৩-এ ১ হাজার ৫৮ কোটি এবং ২০২৩-২৪-এ পৌঁছে ১ হাজার ৭৮ কোটি টাকায়। অর্থাৎ চার বছরে প্রায় ৭৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল রাজস্ব।
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ডিএনসিসির কোষাগারে মাত্র ২৫ কোটি টাকা অবশিষ্ট রয়েছে, যেখানে মাসিক বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয়ই প্রায় ১৩ কোটি টাকা। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনাতেও সমস্যায় পড়েছে কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই আর্থিক ধসের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং সাবেক প্রশাসনের সময় দেওয়া অতিরিক্ত ওয়ার্ক অর্ডার। অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রায় ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকার টেন্ডার দেওয়া হয়েছিল পর্যাপ্ত অর্থ ছাড়াই।
গত ৩ মার্চ ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম, ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন এবং গাজীপুরের প্রশাসক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই সংকটের কথা তুলে ধরেন। নাগরিক সেবা অব্যাহত রাখতে তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিশেষ আর্থিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, অল্প সময়ের ব্যবধানে রেকর্ড রাজস্ব থেকে কোষাগার প্রায় শূন্যে নেমে যাওয়ার ঘটনা ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার প্রতিফলন। এখন সরকারি সহায়তা কত দ্রুত আসে এবং সিটি কর্পোরেশনগুলো নিজেদের রাজস্ব কাঠামো কতটা শক্তিশালী করতে পারে—তার ওপরই নির্ভর করবে ঢাকার নাগরিক সেবার ভবিষ্যৎ।
