চ্যানেল-১৪ প্রতিবেদন: সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে ঘিরে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ সামনে আসছে। দুদকে অভিযোগ দাখিল থেকে শুরু করে তাঁর ঘনিষ্ঠদের অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের তথ্য—সব মিলিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সাবেক এই উপদেষ্টা ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের কর্মকাণ্ড।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে একটি দল আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দাখিল করে।
দুদক সূত্র জানায়, দুপুরের দিকে প্রায় ২০–৩০ জনের একটি দল কার্যালয়ে প্রবেশ করে সাবেক সংসদ সদস্য ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের সমর্থনে স্লোগান দিতে দিতে অভিযোগ জমা দেওয়ার দাবি জানায়।
একপর্যায়ে তারা কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ অভিযোগটি গ্রহণ করে।
দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, বেনামে দাখিল করা এই অভিযোগটি বর্তমানে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। অভিযোগে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া নেওয়া হবে।
বান্ধবীর রাগ ভাঙ্গাতেও পাঠাতেন টাকা
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনুযায়ী, আসিফ মাহমুদের কলেজ পড়ুয়া সাবেক বান্ধবী তাইয়েবা ইসলাম সায়মাকে ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছে। এসএমএস ডাটা বিশ্লেষণে তাঁর মোবাইলে আসিফ মাহমুদের ব্যক্তিগত নম্বর থেকে পাঠানো বার্তার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এছাড়া তাঁর ব্যাংক হিসাবেও অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী— ৪ আগস্ট ২০২৫: ৫০ হাজার টাকা জমা, ৫ আগস্ট ২০২৫: আরও ৫০ হাজার টাকা জমা।
ফলে স্বল্প আয়ের এক কলেজ শিক্ষার্থীর ব্যাংক হিসাবে অল্প সময়ে দুই লাখ টাকার বেশি ব্যালান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দুদকের অনুসন্ধান থেমে যায়
গত বছর আসিফ মাহমুদ ও তাঁর এপিএসকে ঘিরে শতকোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে দুদক অনুসন্ধান শুরু করেছিল।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অজ্ঞাত কারণে সেই অনুসন্ধান মাঝপথে থেমে যায় বলে জানা গেছে।
এপিএসকে ঘিরে শতকোটি টাকার অভিযোগ
আসিফ মাহমুদের সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরেও নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
দুদক সূত্র জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে তদবির-বাণিজ্য, টেন্ডার প্রভাবিত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। পাশাপাশি তাঁর বিদেশে যাওয়া এবং জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।
দুদকের কর্মকর্তারা জানান, মোয়াজ্জেমের ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি ও আর্থিক লেনদেনের তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গাড়িচালক ভাইয়ের কোটি টাকার সম্পদ
মোয়াজ্জেম হোসেনের বড় ভাই রিয়াজুল ইসলাম, যিনি স্থানীয়ভাবে ইলিয়াস মণ্ডল নামে পরিচিত, তাঁর সম্পদ বৃদ্ধিও প্রশ্ন তুলেছে।
একসময় ভাড়ায় গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন রিয়াজুল। কিন্তু মাত্র আট মাসের মধ্যে তাঁর সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর নথি অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ করবর্ষে প্রথমবার রিটার্ন জমা দিয়েই তিনি এই সম্পদের ঘোষণা দেন।
রিটার্নে উল্লেখ করা হয়েছে— ব্যবসায়িক মূলধন: ৯৬ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে এফডিআর: ১৬ লাখ ৯৯ হাজার ৭২৮ টাকা, সঞ্চয়ী হিসাব: ৪ লাখ ২৮ হাজার ৮৬৭ টাকা ও নগদ অর্থ: ৩ লাখ ১৫ হাজার ৯৩১ টাকা।
ডেলটা লাইফ ইনস্যুরেন্সে ১ লাখ ১৩ হাজার ৩৯২ টাকা জমাও আছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই রিয়াজুল ও তাঁর স্ত্রীর নামে দুটি গাড়ি কেনা হয়েছে। টয়োটা নোয়া মাইক্রোবাস (মূল্য: ৪৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা) ও স্ত্রী সাথী খাতুনের নামে একটি প্রাইভেট কার (মূল্য: ১২ লাখ ৯০ হাজার ৫০০ টাকা)।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এপিএস মোয়াজ্জেম ও তাঁর গাড়িচালক ভাই রিয়াজুলের বাবা আজিজার মণ্ডল একসময় কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বাড়ি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বিনোদপুর গ্রামে।
গ্রামে এখনও একটি পুরোনো টিনের ঘর ও ছোট রান্নাঘর রয়েছে। তবে এলাকাবাসীর দাবি, গত এক বছরে পরিবারের আর্থিক অবস্থার দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়েছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “আমার দুইটা গাড়ি আর ব্যাংকে কিছু টাকার এফডিআর ছাড়া আর কিছু নেই। এটা আসলে আইনজীবী করেছে, আমি ঠিক জানি না। আমার সব মিলিয়ে ৮০ লাখ টাকার বেশি সম্পদ হবে না।”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “বৈধ আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জনের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে দুর্নীতির মামলা করে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার বা সরকারি পদে থাকা ব্যক্তির যোগসাজশ থাকলে গভীর তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
দুদকের আইন শাখার এক কর্মকর্তা জানান, দুর্নীতির ঘটনায় সহযোগিতা বা প্ররোচনার অভিযোগ প্রমাণিত হলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ১০৯ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও মামলা করা যেতে পারে।
