চ্যানেল ১৪ প্রতিবেদন: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মূল দায়িত্ব সাংবাদিকতা বিষয়ে গবেষণা, প্রকাশনা এবং দেশজুড়ে সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ প্রদান। পাশাপাশি সংবাদপত্র, বার্তা সংস্থা, রেডিও, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের জন্য পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়াও প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
কিন্তু সেই পিআইবিতেই ভুয়া সেমিনার দেখিয়ে সাংবাদিকদের জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে প্রায় ২৪ লাখ টাকা খরচ দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ‘তারুণ্যের উৎসব ২০২৫’ উপলক্ষে গত বছরের ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি পিআইবিতে চারটি অনুষ্ঠানের নামে বিপুল অঙ্কের ব্যয় দেখানো হয়।
নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ওই চারটি অনুষ্ঠানের বিপরীতে মোট প্রায় ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।
চারটি অনুষ্ঠানের নামে বিপুল ব্যয়
নথি অনুযায়ী প্রথম অনুষ্ঠান ছিল ‘তারুণ্যের উৎসব ২০২৫’ উপলক্ষে সংগীতসন্ধ্যা। ১৮–১৯ ফেব্রুয়ারি পিআইবি অডিটরিয়ামে এই আয়োজনের জন্য মোট ৫ লাখ ৭৩ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।
দ্বিতীয় অনুষ্ঠান ছিল ‘জুলাই অভ্যুত্থানের চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, গ্রাফিতি ও ভিডিও প্রদর্শনী’। একই তারিখে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনের ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা।
তৃতীয় আয়োজন ছিল ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান : সংহতি ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনার। ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই সেমিনারের ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৯১ হাজার ৫০০ টাকা।
এই সেমিনারে ২০০ জন অংশগ্রহণকারীকে এক হাজার টাকা করে দুই লাখ টাকা ভাতা দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকায় অংশগ্রহণকারীদের ফোল্ডার, কলম ও নোটবুক দেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে এবং প্রত্যেকের নামের পাশে ১০ টাকার রাজস্ব স্ট্যাম্প লাগানো হয়েছে।
ঢাকার বাইরে থেকে আসা ৫০ জন অংশগ্রহণকারীর জন্য দুই হাজার টাকা করে এক লাখ টাকা যাতায়াত ভাতা দেখানো হয়েছে। এছাড়া পাঁচজন আলোচকের সম্মানী ১০ হাজার টাকা করে মোট ৫০ হাজার টাকা, ২৫০ প্যাকেট নাশতা ২০০ টাকা করে ৫০ হাজার টাকা এবং ২৫০ প্যাকেট লাঞ্চ ৫০০ টাকা করে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে।
চতুর্থ অনুষ্ঠান ছিল ‘গণ-অভ্যুত্থানের দিশা ও দর্শন’ শীর্ষক সেমিনার। ১৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই সেমিনারের জন্য ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ টাকা।
এখানেও ২০০ জন অংশগ্রহণকারীকে এক হাজার টাকা করে দুই লাখ টাকা ভাতা, ২৫ জনের যাতায়াত ভাতা ৫০ হাজার টাকা, পাঁচজন আলোচকের সম্মানী ৫০ হাজার টাকা, ২৫০ প্যাকেট নাশতা ৫০ হাজার টাকা এবং ২৫০ প্যাকেট লাঞ্চ ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে এই চারটি অনুষ্ঠানের বিপরীতে প্রায় ২৪ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়।
নথিতে স্বাক্ষর, কিন্তু বাস্তবে উপস্থিতি নেই
পিআইবির নথি অনুযায়ী, এসব অনুষ্ঠানের ব্যয়ের হিসাব প্রস্তুত করে স্বাক্ষর করেন প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র রিসার্চ অফিসার ও সমন্বয়কারী গোলাম মুর্শেদ। পরে সেই নথিতে স্বাক্ষর করেন পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ। এরপর প্রতিটি খরচের বিপরীতে ভাউচার সংযুক্ত করা হয়।
কিন্তু নথি যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় থাকা অনেক সাংবাদিকই বাস্তবে সেই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন না।
তালিকায় ‘এস এম আজাদ, কালের কণ্ঠ’ নামে একজন সাংবাদিকের স্বাক্ষর পাওয়া যায়। অথচ কালের কণ্ঠের সাবেক সিনিয়র রিপোর্টার এস এম আজাদ ২০২২ সালে চাকরি ছেড়ে পর্তুগালে চলে যান এবং তখন দেশেই ছিলেন না।
যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি গত বছর পিআইবির কোনো সেমিনারে অংশ নেননি এবং তালিকায় থাকা স্বাক্ষর তাঁর নয়।
এরপর তালিকায় থাকা অন্তত ৭০ জন সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সবাই জানান, তারা এমন কোনো সেমিনারে অংশ নেননি এবং তালিকায় থাকা স্বাক্ষরও তাঁদের নয়।
ঢাকা পোস্টের সিনিয়র রিপোর্টার জসিম উদ্দিন মাহির বলেন, তিনি কোনো সেমিনারে অংশ নেননি এবং স্বাক্ষরও তাঁর নয়।
ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জামিল খান বলেন, তাঁর নাম ব্যবহার করে কে এই কাজ করেছে তা তিনি জানেন না।
দৈনিক জনকণ্ঠের সাংবাদিক ফজলুর রহমান বলেন, তাঁর নাম ব্যবহার করে জালিয়াতি করা হয়েছে।
খুলনার সাংবাদিক শামসুজ্জামান শাহীন জানান, তালিকায় থাকা স্বাক্ষর ভুয়া এবং খুলনার যেসব সাংবাদিকের নাম রয়েছে তাদের কেউ ওই সেমিনারে যাননি।
আলোচকদের নামেও অসঙ্গতি
সেমিনারের আলোচকদের তালিকাতেও অসঙ্গতি পাওয়া যায়।
তালিকায় ‘শহীদুল্লাহ লিপন’ নামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ওই নামে কোনো শিক্ষক সেখানে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সহিদ উল্যাহ জানান, গত কয়েক বছরে তিনি পিআইবিতে কোনো সেমিনারে যাননি এবং নথিতে থাকা স্বাক্ষর তাঁর নয়।
এ ছাড়া ‘খান মোহাম্মদ বাহাদুর’ নামে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষকও পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর জানান, তিনি কখনো পিআইবির কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেননি।
ভাউচারেও মিলছে জালিয়াতির প্রমাণ
ভাউচার যাচাই করেও অসংগতি পাওয়া গেছে।
আল-আমীন আর্ট গ্যালারির নামে দুটি বিল দেখানো হয়েছে, প্রতিটিতে ২০ হাজার টাকা করে। কিন্তু দুটি বিলেই একই মেমো নম্বর ২৮১ ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারীরা জানান, এমন কোনো বড় কাজ তাঁদের মনে নেই এবং বিলের লেখাও তাঁদের নয়।
সোহেল ফ্রেম গ্যালারির নামে ২০ হাজার টাকার আরেকটি বিল দেখানো হয়েছে। দোকানের মালিক জানান, বিলের হাতের লেখার সঙ্গে তাঁদের কারো লেখার মিল নেই।
ডেকোরেশনের জন্য দ্য নিউ নূর অ্যান্ড কোং ডেকোরেটরস-এর নামে তিনটি ভাউচার দেখানো হয়েছে—৬০ হাজার, ৩০ হাজার ও ২৫ হাজার টাকা। দোকানের ম্যানেজার জানান, প্যাড তাঁদের হলেও লেখা ও স্বাক্ষর তাঁদের নয়।
খাবারের বিলেও অসংগতি পাওয়া যায়। বিসমিল্লাহ রেস্তোরাঁর নামে ২৫০টি করে লাঞ্চ প্যাকেট ৫০০ টাকা করে দেখিয়ে মোট আড়াই লাখ টাকা বিল করা হয়েছে। কিন্তু রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ জানান, তাঁদের প্যাকেট খাবারের দাম সাধারণত ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে।
নাশতার বিল দেখানো হয়েছে হক ব্রেড অ্যান্ড কনফেকশনারির নামে। প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার জানান, বিলের হাতের লেখা তাঁদের নয় এবং এমন বড় অর্ডারের কথা তাঁদের মনে নেই।
অনুষ্ঠানগুলোর কোনো ছবি বা রেকর্ড নেই
পিআইবির ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটে ওই সময়ের অন্যান্য কর্মসূচির ছবি ও ভিডিও থাকলেও ৪০০ অংশগ্রহণকারী নিয়ে করা এই দুটি সেমিনারের কোনো ছবি বা ভিডিও পাওয়া যায়নি।
এছাড়া পিআইবির অবকাঠামো বিবেচনায়ও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ২৩৮ আসনের একটি অডিটরিয়াম এবং কয়েকটি ছোট সেমিনার কক্ষ রয়েছে। ফলে একসঙ্গে ২০০ জন অংশগ্রহণকারী নিয়ে দুটি সেমিনার আয়োজন করা বাস্তবে কঠিন।
পিআইবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওই সময় তারুণ্যের উৎসব চলাকালে অন্য কোনো সেমিনার হয়নি।
তদন্তে উঠে আসে নির্দেশের অভিযোগ
প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে নথি সামনে আনা হলে সমন্বয়কারী গোলাম মুর্শেদ অনুসন্ধানী টিমকে জানান, মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফের নির্দেশেই তিনি এসব কাজ করেছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ফারুক ওয়াসিফ বলেন, পিআইবির একটি দুষ্টচক্র ভুয়া বিল তৈরি করেছিল। তিনি দাবি করেন, তিনি এসব অনুমোদন দেননি এবং এই খাতে কোনো টাকা খরচ হয়নি।
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন অনেক ফাইলে স্বাক্ষর করতে হয়। একটি ফাইলে স্বাক্ষর করার পর ভুয়া বিলের বিষয়টি সামনে এলে সেটি বাতিল করা হয়।
ব্যাংক হিসাব বলছে ভিন্ন কথা
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পিআইবির ‘সম্পাদক নিরীক্ষা’ নামে সোনালী ব্যাংকের ভিকারুননিসা নূন স্কুল শাখার একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ২০২৫ সালের ২৯ ও ৩০ জুন চারটি চেকের মাধ্যমে মোট ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
চারটি চেকের অঙ্ক ছিল— ৬ লাখ ৯১ হাজার ৫০০ টাকা, ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা, ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ টাকা ও ৫ লাখ ৭৩ হাজার টাকা।
যা চারটি অনুষ্ঠানের বিলের অঙ্কের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
