চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশের রফতানি আয় কমেছে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকা রফতানি প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
অর্থবছরের শুরুতে রফতানি খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও পরবর্তী সময় তা ধীরে ধীরে নিম্নমুখী হতে থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা কারণে রফতানি খাত বর্তমানে বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বন্দর ব্যবস্থাপনায় জটিলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং বিনিয়োগে মন্দাভাব রফতানি খাতকে প্রভাবিত করছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাহিদা কমে যাওয়াও রফতানি হ্রাসের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রফতানি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক রফতানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়েছে। দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতনির্ভর হওয়ায় এ খাতে যেকোনো ধাক্কা পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।
এদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন অনিশ্চয়তাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় এবং হরমুজ প্রণালিতে পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়, তবে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার ৬০ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর এবং এর বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। ফলে এই অঞ্চলের অস্থিরতা দেশের শিল্প ও রফতানি খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা বাংলাদেশের রফতানি কাঠামোকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। তাই রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এখন সময়ের দাবি।
তাদের মতে, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ, আইটি সেবা এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য রফতানিতে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এসব খাতের উন্নয়নে কার্যকর শিল্পনীতি, প্রযুক্তি সহায়তা এবং মান নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
এছাড়া বন্দর ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি। বর্তমানে দীর্ঘ লিড টাইমের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা দ্রুত সরবরাহের সুবিধার জন্য অন্য দেশের বাজারে ঝুঁকছেন।
অন্যদিকে শিল্প খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়াও রফতানি হ্রাসের একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির এলসি কমে যাওয়ায় নতুন শিল্প স্থাপন ও সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রফতানি খাত পুনরুদ্ধারে জ্বালানির স্থিতিশীল সরবরাহ, প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়ন সুবিধা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
এ ছাড়া আগামী দিনে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশের রফতানি খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন বাড়াতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।