চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকায় সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যাচেষ্টার ঘটনা দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটি এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে পুরোনো প্রশ্ন নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা কার্যকর?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণ মামলায় আদালত একা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে না। মামলা গ্রহণ, তদন্ত, সাক্ষ্য সংগ্রহ ও প্রসিকিউশনের প্রায় পুরো প্রক্রিয়াই রাষ্ট্রনির্ভর। ফলে তদন্তের গাফিলতি, সাক্ষ্য উপস্থাপনে দুর্বলতা বা প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই ৩৫ জন নারী ও মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১০টি ছিল গণধর্ষণের ঘটনা, দুজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত ৭৪৯ জন নারী ও মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন; ১৪০টি গণধর্ষণ এবং ৩৬টি ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে নরসিংদী, পাবনা, ভোলা, হাতিয়া ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে বিচার চাইতে গিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারকে সামাজিক চাপ, হুমকি বা এলাকা ছাড়ার নির্দেশনার মুখে পড়তে হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, মামলা দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকা, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব, সামাজিক লাঞ্ছনা ও আর্থিক চাপ—সব মিলিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার অনেক সময় বিচারপ্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটনাই আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা হিসেবে নিবন্ধিত হয় না।
আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া গণমাধ্যমকে বলেছেন, প্রতি ১০০টি ঘটনার মধ্যে প্রায় ৩০টি রিপোর্টই হয় না। তিনি আরও বলেন, কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও বিচারপ্রক্রিয়ার জটিলতা ও প্রমাণের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা অনেক ক্ষেত্রে দণ্ড নিশ্চিত করতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
২০২০ সালে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হলেও বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, কেবল শাস্তি কঠোর করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষা, ভুক্তভোগীর পুনর্বাসন এবং বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বাড়ানো জরুরি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভুক্তভোগীদের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ, আইনি সহায়তা সহজলভ্য করা এবং সাক্ষী সুরক্ষা কার্যকর করার দাবি জানিয়ে আসছে। তাঁদের মতে, প্রভাবশালী অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে কঠোর আইনও কার্যকর হবে না।
সীতাকুণ্ডের ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে এই ধারাবাহিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র কি আরও সক্রিয় ভূমিকা নেবে? দ্রুত তদন্ত, দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এসব পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
লেখকঃ শাহানা হুদা রঞ্জনা
