বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে দেয়ার ‘কায়দা’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বেশ উত্তাল। তাকে মোটামুটি অপমান করে উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে শুনতে পেরেছি। একদল তার প্রতি এই আচরণে হতাশা প্রকাশ করেছেন, বলছেন এটি ঠিক হয়নি। আরেক দল বলছে তার আগের শেষ নিয়মিত গভর্নর আবদুর রউফকে তো জান নিয়ে পালাতে হয়েছে, সেই তুলনায় তার প্রস্থান অতটা মন্দ হয়নি। কেউ কেউ বলছেন মনসুর সাহেব নাকি আওয়ামী লীগের সময়ের খাদে তলিয়ে যাওয়া অর্থনীতি থেকে দেশকে উদ্ধার করেছেন। অথচ আমার জানামতে আওয়ামী লীগের সময়ে দুর্নীতি হলেও অর্থনীতির সমস্ত সূচক বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল।
আওয়ামী বিরোধী পক্ষ মূলত দেশের ক্রান্তিকালেও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ধরে রাখা এবং রিজার্ভের উর্ধগতির জন্য মনসুর সাহেবকে কৃতিত্ব দিয়েছেন। অথচ মূল বিষয় হচ্ছে ডঃ ইউনুসের সরকারের সময় নতুন কোন উন্নয়ন প্রকল্প না থাকায় এবং শেখ হাসিনা সরকারের সমস্ত বড় উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ করে দেয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা খরচের কোন জায়গা ছিল না। ফলশ্রুতিতে রিজার্ভ না বাড়ার কোন কারণ আমি দেখি না। ইসলামী ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার নামে সেখান থেকে এনসিপি ও ডঃ ইউনুস সরকারের উপদেষ্টারা যে পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছে, আমার প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সেটি এস আলম গ্রুপের আত্মসাৎকৃত অর্থের চাইতেও বেশী।
অর্থাৎ মনসুর সাহেবকে গভর্নর হিসেবে কোন কৃতিত্ব দেবার সুযোগ নেই। মনসুর সাহেবকে রিজার্ভ ধরে রাখা কিংবা বাড়ানোর জন্য গভর্নর হিসেবে কৃতিত্ব দেয়া এবং বিনিয়োগ বোর্ডের প্রধান আশিক চৌধুরীকে আকাশ থেকে ঝাঁপ দিয়ে গিনিজ রেকর্ড করার জন্য কৃতিত্ব দেয়া একই পর্যায়ে পড়ে। তারা এমন কাজ করে প্রশংসার দাবীদার হচ্ছেন যাতে হয় তাদের কৃতিত্ব নেই, অথবা যে কাজ তাদের করার কথা নয়।
তাই বলে কি আমি মনসুর সাহেবকে ‘মব’ দিয়ে অপমানিত করাকে সমর্থন করছি? না তা করছি না। আগে করলে পরেও করতে হবে এই ধারায় আমি বিশ্বাস করি না। আমি মনে করি যে কোন দিন, যে কোন সরকার, যে কোন পর্যায় থেকে ‘পজিটিভ’ চেঞ্জ শুরু হতে পারে।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে আলোচনাটা দেখছি না, সেটা আমি করতে চাই। মনসুর সাহেব ১৩ অগাস্ট ২০২৪ ডঃ ইউনুসের আহ্বানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে ৫, ৬, ৭ অগাস্ট দেশে গণলুন্ঠন, অত্যাচার, লুটপাট, হত্যাকান্ড তিনি দেখেছেন। তিনি দেখেছেন অসাংবিধানিকভাবে কিছু সন্ত্রাসী ডঃ ইউনুসকে দেশের সরকার প্রধান নির্বাচিত করেছে। মনসুর সাহেব দেখেছেন ৮ অগাস্ট ২০২৪ ডঃ ইউনুস ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকে বাংলাদেশের জাতির জনক, ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে হামলার ঘটনায় পরোক্ষভাবে উৎসাহ যুগিয়েছেন, সমর্থন দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে অসম্মান, অপমানিত করেছেন। হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, পুলিশকে হত্যা, গুম-খুন করতে দেখেছেন ও উৎসাহ দিয়েছেন। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে সাথে নিয়ে দেশ চালানোর অঙ্গীকার করেছেন। এই সবকিছু দেখবার পরেও যখন মনসুর সাহেব ডঃ ইউনুসের মতো শঠ মানুষের আহ্বানে বাংলাদেশ গভর্নরের সামান্য একটা চাকরির লোভ সামলাতে পারলেন না; তখন তার প্রতি কোন অনুরাগ কিংবা সহমর্মিতা আমার নেই। তিনিও নিজেকে ডঃ ইউনুসের মতোই একজন লোভী, ধূর্ত, সুযোগসন্ধানী হিসেবে প্রমাণ করেছেন।
এমনকি তিনি যদি দেশের অর্থনীতিতে কোন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারতেন, তবুও হয়ত তার প্রতি দয়ার্দ্র হতাম। কিন্তু তাকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক গ্লোবাল ফাইন্যান্স ম্যাগাজিনের র্যাংকিংয়ে গভর্নর হিসেবে C+ গ্রেড দিয়েছে; যা তার ব্যর্থতাকে ইঙ্গিত করে। উল্লেখ্য সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াসহ পুরো বিশ্বে যখন মূল্যস্ফীতি কমছিল, তখন মনসুর সাহেবের সময় আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এটি ছিল সর্বোচ্চ। মনসুর সাহেব ক্ষমতা নেয়ার পর পর ইসলামী ব্যাংকগুলোকে ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে দেয় তাদের বাঁচিয়ে রাখার অজুহাত তুলে। তারপর আবার ইসলামী ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার সময় আরও ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে দিয়েছেন। এর বাইরেও তিনি ন্যূনতম আরও ১০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়েছেন সরকারের অনুরোধ এই তথ্য টাকশাল থেকে জানা গেছে। তার এই স্বল্পসময়ে দায়িত্ব পালনকালে তিনি অন্তত ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়েছেন যা শেখ হাসিনার পুরো শাসনামলে ছাপানো টাকার সমান। এছাড়াও ডঃ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার দেশের রাজস্বখাতে ৪০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রেখে গেছে মনসুর সাহেবের অংশগ্রহণে। দেশের অর্থনীতিতে কার্যত তার কোন অবদান নেই। এছাড়া ডঃ ইউনুসের শাসনামলে বাংলাদেশে নতুন কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার। একটি অন্ধকার সময় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে একটি দেশে ৫ হাজার নতুন কোটিপতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের হস্তক্ষেপ ছাড়া জন্ম নিতে পারে না।
আমি যদি একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে বিবেচনা করতে চাই, তাহলে একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সাফল্য বা ব্যর্থতা কেবল রিজার্ভের অঙ্ক দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অগ্রগতিতে গভর্নরের কার্যকারিতা বোঝার জন্য অন্তত পাঁচটি সূচক আমি বিবেচনা করব যা ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি ।
প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মনসুর সাহেবের ব্যর্থতা। একটি স্থিতিশীল ও সহনীয় মূল্যস্ফীতি হার অর্থনীতির সুস্বাস্থ্যের প্রধান শর্ত। কিন্তু তার সময়ে যখন সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী, তখন বাংলাদেশে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করেছে। যেখানে ৬ শতাংশের উপরে মূল্যস্ফীতি ধারণ করার মতো অর্থনীতি বাংলাদেশের নেই, সেখানে মনসুর সাহেবের সময় প্রকৃত মূল্যস্ফীতি অনেক সময় দুই অংকে গড়িয়েছে, বেশীরভাগ সময় ৮-৯ শতাংশে অবস্থান করেছে। ফলশ্রুতিতে খাদ্য সামগ্রী যেমন চাল, ভোজ্য তেল, শাকসবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বেড়েছে।
দ্বিতীয়ত, মুদ্রানীতি স্থির রাখার ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা ও অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক ব্যর্থতা দেখেছি আমরা মনসুর সাহেবের সময়। দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যাংকিং খাতে ৫০-৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপানো কোন বিচক্ষণ মুদ্রানীতির পরিচায়ক নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়নের করেছে।
তৃতীয়ত, তার নেতৃত্বে বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাতে অনাস্থা। একজন দক্ষ গভর্নর সুদের হার, তারল্য ও নীতিগত স্থিতিশীলতার মাধ্যমে দেশি বিদেশি বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনেন। মনসুর সাহেবের সময় বিনিয়োগ বোর্ডের প্রধান ও তার সমন্বিত Macroeconomic policy নির্ধারণের ব্যর্থতায় বিনিয়োগে গতি আসেনি, বরং অনিশ্চয়তা বেড়েছে। যদিও ডঃ ইউনুস সরকার শেখ হাসিনা সরকারের সময়কার বিনিয়োগকে নিজেদের বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগ আলোচনাকে বিনিয়োগের পরিমাণ হিসেবে জাহির করতে চেয়েছে, কিন্তু ২০২৫ অর্থ বছরে বাংলাদেশে প্রকৃত বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ০.৬৫ বিলিয়ন ডলার যা এমনকি শেখ হাসিনার ২০২২-২৩ সালের ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায়ও নগণ্য। উল্লেখ্য আমরা মনে করি শেখ হাসিনা সরকারের অন্যতম ব্যর্থতা ছিল বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে না পারা; সেখানে আন্তর্জাতিক খ্যাতি থাকার পরও ডঃ ইউনুস তার স্টান্টবয় আশিক সাহেব ও গভর্নর মনসুর সাহেবকে নিয়ে বিনিয়োগ শেখ হাসিনার সময়কালের ৬ ভাগের ১ ভাগে নামিয়ে এনেছেন। অথচ সারা বিশ্বব্যাপী কোভিডের ধাক্কা কাটিয়ে মূলত ২০২৫ এ বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়া শুরু করেছিল।
চতুর্থত, বিনিময় হার ও বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ে কৌশলগত ব্যাখ্যায় ধূর্ততার আশ্রয় নিয়েছিলেন মনসুর সাহেব ও ডঃ ইউনুস। উন্নয়নখাতে কোন খরচ না হওয়ায় চলমান রিজার্ভের ধারা ধরে রাখা কোন সাফল্য নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক আস্থার মাধ্যমে টেকসই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। রেমিটেন্সের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে একটি চলমান বাস্তবতা কিন্তু এর বাইরে মনসুর সাহেবের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে অবকাঠামোগত কিংবা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কোন উল্লেখযোগ্য সাফল্য নেই।
পঞ্চমত, আর্থিক খাতের সুশাসন ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনায় মনসুর সাহেবের ব্যর্থতা প্রমাণসম। ইসলামী ব্যাংকগুলোতে বিপুল পরিমাণ টাকা ছাপিয়ে দেয়া ও একীভূতকরণের নামে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত করেছে। ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ও বন্ধকীকৃত ঋণের মান ও পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্টে দেখা গেছে Non Performing Loan (NPL) বা খেলাপী ঋণের আকার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যাংকিং সেক্টরের পুনরুদ্ধার ধীর করে দিয়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রয়োগকে সংকুচিত করেছে। আর্থিকখাতে মনসুর সাহেবের সময় খেলাপী ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ, যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম শীর্ষে।
এছাড়াও বেসরকারিখাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ আস্থা দুর্বল থাকায় ব্যক্তিগত খাতের ক্রিয়াশীলতা কমে গেছে এবং বিনিয়োগের গতি স্থিতিশীল হয়নি, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করেছে। এগুলো সবটাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত সূচক, যা দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত উন্নয়ন ও আস্থা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়, তিনি এই মৌলিক সূচকগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেননি — যা সমগ্র অর্থনীতির গতিশীলতাকে সীমিত করেছে এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ঝুঁকির সম্মুখীন করেছে।
অতএব সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মৌলিক সূচকগুলোতে মনসুর সাহেবের আমলে কোন দৃশ্যমান সাফল্য দেখা যায়নি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, মুদ্রানীতির শৃঙ্খলা রক্ষা করতে না পারা, বিনিয়োগে গতি আনতে অক্ষমতা, বৈদেশিক খাতে কাঠামোগত শক্তি তৈরি না করা এবং ব্যাংকিং সুশাসনে অবনতি—এই পাঁচ ক্ষেত্রেই তার ব্যর্থতার ছাপ স্পষ্ট। ফলে তাকে কেবল প্রশাসনিকভাবে অপসারণ একটি স্বাভাবিক ঘটনা, অর্থনৈতিক কর্মদক্ষতার নিরিখেও তাকে কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হতেই হবে।
সরি মনসুর সাহেব। আপনি ‘মবাক্রান্ত’ হওয়ায় আমি দুঃখিত হলেও, গভর্নর হিসেবে আপনার অপসারণে আমি দুঃখিত নই। সমগ্র জীবন একজন অর্থনীতিবিদ এবং পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের প্রধান হিসেবে আপনি অনেক সুনাম কুড়ালেও বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম ব্যর্থ গভর্নর হিসেবে বাংলাদেশ আপনাকে মনে রাখবে।
লেখকঃ শামীম আহমেদ
