২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মৃত্যুর পর গেজেটে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন আল হামীম সায়মন। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের জুলাই অভ্যুত্থান শাখা প্রকাশিত তালিকার ৮৪৪ জনের মধ্যে ১০৭ নম্বরে রয়েছে তার নাম। পরিবারের হাতে পৌঁছায় ৩০ লাখ টাকার সরকারি সহায়তা। কিন্তু প্রায় দুই বছর পর তার মৃত্যু নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন—তিনি কি সত্যিই আন্দোলনে নিহত হয়েছিলেন, নাকি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু হয়েছিল?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সায়মনের মৃত্যু ঘিরে সরকারি বর্ণনা ও স্থানীয়দের বক্তব্যের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তিনি আন্দোলনে অংশ নেননি; বরং কাকরাইলের একটি বারে অতিরিক্ত মদ্যপানের পর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। পরে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ নিয়ে দাফন করা হয়।
আন্দোলনে না গিয়েও ‘জুলাই শহীদ’?
ঘটনার দিন বিকেলে বাসা থেকে বের হন সবুজবাগের দক্ষিণগাঁও এলাকার বাসিন্দা সায়মন। পরিবার দাবি করে, তিনি রামপুরা এলাকায় আন্দোলনে গিয়ে হামলার শিকার হন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মরদেহ পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তার বাবা কামরুজ্জামান রামপুরা থানায় অজ্ঞাত ১০০–১৫০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
তবে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, সায়মন আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন না; বরং তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলনবিরোধী অবস্থান নিতেন। তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে পরে সংশ্লিষ্ট পোস্টগুলো মুছে ফেলা হয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।
ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মৃত্যু সনদে লেখা ছিল—“Brought In Dead. Cause of death will be ascertained after post mortem. H/O Physical Assault।” অর্থাৎ, ময়নাতদন্ত ছাড়া মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত নয়। হাসপাতালের টিকিটে ‘বুলেট ইনজুরি’ উল্লেখ থাকলেও চিকিৎসকরা পরে জানান, এটেন্ডেন্টের কথার ভিত্তিতে তা লেখা হয়েছিল; শরীরে দৃশ্যমান আঘাত পাওয়া যায়নি।
সবুজবাগ থানার উপপরিদর্শক বিমল মধু জানান, পরিবারের লিখিত প্রত্যয়ন ও অনুরোধের ভিত্তিতে সুরতহাল করে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। তার দাবি, শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন ছিল না।
বারে মদ্যপান ও অসুস্থতার দাবি
সায়মনের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ‘ছোট হামজা’ দাবি করেছেন, ঘটনার দিন তারা কাকরাইলের একটি বারে যান। সেখানে সায়মন মদ্যপান করে অসুস্থ হয়ে পড়েন, বমি করতে থাকেন এবং পরে সিএনজিতে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। হামজার ভাষ্য, পুলিশের ভয়ে সে সময় তারা মদ্যপানের কথা গোপন করেছিলেন।
স্থানীয় কয়েকজনও দাবি করেন, সায়মনের মৃত্যু অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে। যদিও বারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সহায়তার অর্থ ও মামলা নিয়ে প্রশ্ন
সরকারি সহায়তা হিসেবে পরিবারের কাছে ৩০ লাখ টাকা পৌঁছায়—প্রথমে তা অস্বীকার করলেও পরে সায়মনের বাবা জানান, তার নামে এফডিআর করা হয়েছে। কেন মৃত্যুর প্রায় এক বছর পর হত্যা মামলা করা হলো—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, সরকারের পরামর্শে মামলা করেছেন।
মামলার তদন্ত করছেন রামপুরা থানার উপপরিদর্শক মাসুদ রানা। তিনি বলেন, তদন্ত চলমান; মন্ত্রণালয় ও হাসপাতাল থেকে তথ্য চাওয়া হয়েছে। তবে মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তদন্তের দাবি
পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, জুলাই-সংক্রান্ত প্রতারণার অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাও বলেন, প্রমাণ পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মরদেহ উত্তোলন করে পরীক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
আল হামীম সায়মনের মৃত্যু তাই এখন শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি গেজেটভুক্ত ‘জুলাই শহীদ’ তালিকার স্বচ্ছতা, সরকারি সহায়তা এবং তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
