কাতারে নির্মাণশ্রমিক, নিউইয়র্কে ট্যাক্সিচালক কিন্তু স্বপ্ন ছিল গ্রামের শিশুদের হাতে বই তুলে দেওয়ার। তিন দশকের বেশি সময় প্রবাসে পরিশ্রম করে নিজ গ্রামে ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার ধান্যদৌল গ্রামের মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী।
এসএসসির আগেই বাবাকে হারান তিনি। বাবা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী ছিলেন স্কুলশিক্ষক। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে ছোট কাঁধে উঠে আসে সংসারের ভার। মা ও পাঁচ ভাই-বোনের দায়িত্ব নিতে ১৯৮২ সালে পাড়ি জমান কাতারে। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে সাত ফুট পাথর ভেঙে পাইলিং করার মতো কঠিন কাজও করেছেন। হাতে ফোসকা, পায়ে আঘাত—তবু থামেননি। চার বছর পর দেশে ফিরে কিছুটা সচ্ছলতা অর্জন করেন।
ধান্যদৌল ও আশপাশের গ্রামে তখন কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না। স্থানীয়দের সঙ্গে বৈঠকে জমির অভাবে স্কুল প্রতিষ্ঠা আটকে গেলে এগিয়ে আসেন মোশাররফ। নিজের উপার্জিত অর্থে জমি কেনার ঘোষণা দেন। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়। বর্তমানে এমপিওভুক্ত এ প্রতিষ্ঠানে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পাড়ি জমান তিনি। শুরুতে নির্মাণশ্রমিক, পরে রেস্তোরাঁ ও ফাস্ট ফুডের দোকানে কাজ করেন। ১৯৯২ সালে ট্যাক্সি চালানোর লাইসেন্স পান। এরপর তিন দশকের বেশি সময় ধরে ট্যাক্সিচালক হিসেবে কাজ করছেন। প্রবাসের আয়ের বড় অংশ ব্যয় করেছেন নিজ এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে।
১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও আব্দুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ। পরে গড়ে তোলেন আশেদা-জোবেদা খান চৌধুরী ফোরকানিয়া মাদরাসা, মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী হাফেজিয়া মাদরাসা এবং মুমু-রোহান কিন্ডারগার্টেন। এ ছাড়া আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী লাইব্রেরি ও ডা. মিজানুর রহমান চৌধুরী কিশোরী পাঠাগার নামে দুটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন। ডায়াবেটিক হাসপাতালের জন্য দুই কোটি টাকা সমমূল্যের জমি দিয়েছেন। ঈদগাহ, কবরস্থান ও মসজিদের উন্নয়নেও অবদান রেখেছেন।
তার প্রতিষ্ঠিত কলেজে বর্তমানে ১০ বিষয়ে স্নাতক ও এক বিষয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থী প্রায় পাঁচ হাজার। এইচএসসি ফলাফলে কুমিল্লা বোর্ডের সেরা ১০ কলেজের তালিকায় স্থান পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তার গড়া সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই এমপিওভুক্ত হয়েছে।
শুধু প্রতিষ্ঠান গড়েই থেমে থাকেননি। নিজের নামে ফাউন্ডেশন গড়ে ২০০ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিয়েছেন। ১০টি গৃহহীন পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন। ধান্যদৌল গ্রামের শতবর্ষী একটি বটগাছ বিক্রি হয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে ক্রেতার কাছ থেকে এক লাখ টাকায় কিনে তা মন্দির কর্তৃপক্ষকে দান করেন, যাতে গাছটি কাটা না হয়।
ব্যক্তিজীবনে দুই সন্তানের জনক মোশাররফ এখনো নিউইয়র্কে মেসে থাকেন। স্ত্রী-সন্তানরা থাকেন দেশে। পরিবারের সবাইকে যুক্তরাষ্ট্রে না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে বলেন, খরচ কমিয়ে সেই অর্থ দেশের মানুষের কাজে ব্যয় করতেই এই সিদ্ধান্ত।
বর্তমানে তার বয়স ৬২ বছর। তরুণ বয়সে পড়াশোনায় ছেদ পড়লেও এখন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক পর্যায়ে পড়ছেন। তার ভাষায়, “পড়াশোনার কোনো বয়স নেই।”
ভোগ নয়, ত্যাগের দর্শনে বিশ্বাসী এই প্রবাসী বলেন, মানুষের জন্য কিছু করতে পারলেই তার সবচেয়ে বেশি আনন্দ হয়।
