পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম খানের কারাগারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু আবারও দেশের কারা ব্যবস্থার চিকিৎসা অবকাঠামো ও বন্দিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। রাজনৈতিক মামলায় আটক থাকা এই নেতা শুক্রবার বিকেলে অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রথমে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
কারা সূত্র জানায়, বিকেল সাড়ে চারটার দিকে কারাগারে তিনি হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছিলেন এবং তার হার্টে ব্লক ছিল। এর আগে তাকে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, গুরুতর অসুস্থ একজন বন্দিকে কেন বিশেষজ্ঞ তত্ত্বাবধানে রাখা হয়নি এবং তার শারীরিক অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণে ছিল কি না।
শফিকুল ইসলামের মৃত্যু একক কোনো ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিভিন্ন কারাগারে আটক থাকা আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতার মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। পাবনা জেলা কারাগারে বন্দি থাকা আওয়ামী লীগ নেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রলয় চাকী হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান। চট্টগ্রামে উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবদুর রহমান মিয়া ক্যান্সারে আক্রান্ত অবস্থায় কারাগার ও হাসপাতালের মধ্যে চিকিৎসাধীন থেকে মৃত্যুবরণ করেন। গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামিকুল ইসলাম সরকার লিপনও কারাগারে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান। বগুড়া, টাঙ্গাইল ও ঢাকাসহ আরও কয়েকটি কারাগারেও একই ধরনের মৃত্যুর খবর এসেছে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, অসুস্থতার শুরুতে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং অবস্থার অবনতি হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ফলে সময়মতো উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত হয়নি বলে তাদের দাবি। যদিও কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে বন্দিদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশের কারা বিধি অনুযায়ী, বন্দিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের ক্ষেত্রে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরের বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব, পর্যাপ্ত সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক অনুমতির জটিলতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। কারা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা জানান, কারাগারে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হলেও জটিল রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা নেই এবং অনেক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয়।
আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, বিচারাধীন বা রাজনৈতিক মামলায় আটক ব্যক্তিদের জীবনরক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ। ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক নেতাদের কারাগারে মৃত্যু জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার প্রশ্ন তুলছে। তাদের মতে, প্রতিটি মৃত্যুর ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত হওয়া উচিত, যাতে অবহেলা বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থাকলে তা চিহ্নিত করা যায়।
শফিকুল ইসলাম খানের মৃত্যু তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি বৃহত্তর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে। বন্দিদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি কি নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রয়েছে, গুরুতর অসুস্থদের ক্ষেত্রে যথাযথ মেডিকেল প্রোটোকল অনুসরণ হচ্ছে কি না, চিকিৎসায় বিলম্বের পেছনে প্রশাসনিক জটিলতা আছে কি না এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি।
ধারাবাহিক এই মৃত্যুগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিফলন সেই প্রশ্ন এখন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
