নির্বাচন নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই, কে ক্ষমতায় এলো, আর কে এলোনা— আমার ভাবনা এসবেরও উর্ধ্বে। বিপর্যয়ের তারিখ ০৫ আগস্ট, নতুন করে কোনো নির্বাচনের তারিখ বিপর্যয়ের দিন হতে পারেনা। ০৫ আগস্টেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে এদেশের ভাগ্যে কী আছে। একইসাথে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান তার ব্যক্তিগত এক্স হ্যান্ডেলে যে লেখাটি দিয়েছেন, সেটি দেখেও অবাক হইনি। কারণ আমার জানা আছে কাকে দিয়ে কী হতে পারে, কারা কী করতে পারে!
তবে বিরানব্বই পার্সেন্ট সংখ্যাগুরুর দেশে বাস করা একজন সাধারণ সংখ্যাগুরু নাগরিক হিশেবে তার এই বিতর্কিত ও নারীর প্রতি অবমাননাকর লেখার বিরুদ্ধে কিছু কথা লেখা প্রয়োজন।
➤ জামায়াতে আমির খুব স্পষ্টভাবে নারী নেতৃত্বকে নিষিদ্ধ এবং তা ‘আল্লাহ বয়ান’ বলে উল্লেখ করেছেন। আমরা জানি, ইসলাম ধর্মমতে আল-কুরান’ই একমাত্র আল্লাহর বাণী। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত এবং অনুসন্ধান বলছে, কুরানে সরাসরি কোথাও বলা নেই যে নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারবে না। অর্থাৎ, আল্লাহ যা বলেননি, জামায়াতের বাংলাদেশ শাখার ঈশ্বরটি তা বলে দিয়েছেন।
বরং কুরআনে এসেছে—
“মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের সহায়ক”
—(সূরা আত-তাওবা : ৭১)
এখানে নেতৃত্ব কিংবা দায়িত্বে লিঙ্গভিত্তিক নিষেধ নেই।
কুরানের আরেকটি সূরা, আন-নামল। সেখানে বর্ণিত সাবা দেশের রানী বিলকিসের ঘটনাটাও আরেকটি উদাহরণ।
হুদহুদ পাখি হজরত সুলাইমান (আ.)-কে জানায়—
সাবা দেশে একজন নারী শাসক আছেন, তার একটি শক্তিশালী রাজ্য আছে, এবং তিনি ও তার জাতি সূর্যপূজা করে। লক্ষ্য করুন— কুরআনে ঐ নারীর শাসক হওয়াকে কোনো জায়গায় নিন্দা করেনি।
সুলাইমান (আ.) রানী বিলকিসকে চিঠি পাঠান— “অহংকার করো না, আত্মসমর্পণ করো (আল্লাহর কাছে)।”
দেখুন, চিঠির ভাষা ছিল শান্ত, কূটনৈতিক ও মর্যাদাপূর্ণ— শফিকুরের মতো নারী সমাজকে ঘৃণা করে নয়।
এরপর রানী বিলকিস তার রাজদরবারের সভাসদগণের পরামর্শ নেন। তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করেন, সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে কূটনীতিকে বেছে নেন, এমনকি উপঢৌকন পাঠান—পরিস্থিতি বোঝার জন্য। পরবর্তীতে তিনি অহংকার না দেখিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। (এগুলো সবই সূরা আন-নামলে বর্ণিত ঘটনার বাংলা অনুবাদ।)
➤ রানী বিলকিসের এই ঘটনা থেকে নারীর নেতৃত্ব বিষয়ে কী শিক্ষা পাওয়া যায়?
প্রথমত— কুরআন নারী শাসককে স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে, কুরআন বলেনি “নারী শাসক হওয়া ভুল”, বরং তার বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা তুলে ধরেছে। যদি নারী নেতৃত্ব হারাম হতো, কুরআন নিশ্চয় এখানে সতর্ক করতো।
দ্বিতীয়ত— যোগ্যতা ও চরিত্রই বড়ো কথা, লিঙ্গ বৈষম্য নয়।
বিলকিস ছিলেন বিচক্ষণ, পরামর্শনির্ভর, শান্তিপ্রিয়, বাস্তববাদী। ইসলামের দৃষ্টিতেও নেতৃত্বের মানদণ্ড— আমল, ন্যায়বিচার, প্রজ্ঞা। অর্থাৎ, লিঙ্গ নয়, নৈতিক অবস্থানই মূল। কুরআন বিলকিসকে দুর্বল, আবেগপ্রবণ, সিদ্ধান্তে অযোগ্য— এভাবে চিত্রিত করেনি।
নারী নেতৃত্ব হারাম প্রসঙ্গে কেউ-কেউ হাদিসের উদাহরণ দিতে পারেন, কিন্তু সেটিও বিতর্কিত। কুরান আল্লাহর বয়ান, হাদিস নয়।
➤ “নারী ঘরের বাইরে গেলে তা পতিতাবৃত্তির আরেক রূপ”—এটা কি ইসলামি কথা?
—না, এটা কোনোভাবেই ইসলামি ভাষা নয়।
বরং আমরা দেখছি, খাদিজা (রা.)— যিনি নবি মুহাম্মদ (সা.) এর স্ত্রী, তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী। নবির (সা.) আরেক স্ত্রী আয়েশা (রা.) ছিলেন শিক্ষক, হাদিস বর্ণনাকারী, রাজনীতিতে মতদাতা। এছাড়াও সাহাবি নারীরা যুদ্ধক্ষেত্রে সেবিকা, রসদ সরবরাহকারী, এমনকি মতামতদাতা হিশেবেও ভূমিকা পালন করেছেন।
অর্থাৎ, নারীর স্বাধীন কাজকর্মকে বেশ্যাবৃত্তির সাথে তুলনা করা— এটি নৈতিক আতঙ্ক (moral panic) তৈরির রাজনৈতিক ভাষা। ইসলাম কখনোই নারীর কাজ করা কিংবা স্বাধীন চলাফেরাকে অশ্লীলতা বা পতিতাবৃত্তি বলেনি। কিন্তু জামায়াতে ইসলাম তা বলেছে।
➤ “আধুনিকতা মানেই নৈতিক পতন”—এই যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?
—এটা নৈতিক মূল্যায়ন, ধর্মীয় বিধান নয়।
ইসলাম অশ্লীলতা নিষিদ্ধ করে, শোষণ নিষিদ্ধ করে, হয়রানিকে হারাম করেছে। কিন্তু সমস্যা আধুনিকতায় নয়, সমস্যা— ন্যায়বিচারের অভাব, পুরুষতান্ত্রিক শোষণ ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতায়। এগুলোর দায় নারীর ঘরের বাইরে যাওয়ার ওপর চাপানো ইসলামি ইনসাফ নয়।
➤ তাহলে শফিকুরের লেখাটা আসলে কী?
—সোজা ভাষায় বললে— এটা একটি রাজনৈতিক–আদর্শিক ব্যাখ্যা, ইসলামকে একটি নির্দিষ্ট দলের ও মতাদর্শের পক্ষে ব্যবহার করা হয়েছে। ইসলামের ভেতরের মতভেদ, প্রেক্ষাপট, ইতিহাস—সব বাদ দিয়ে একটি একপেশে কঠোর ব্যাখ্যা চাপানো হয়েছে।
অর্থাৎ, জামায়াতে ইসলাম মানেই আপনার পালন করা ধর্ম ‘ইসলাম’ নয়। একটি ধর্ম, অন্যটি রাজনৈতিক দল। এই পার্থক্যটি সবসময় খেয়াল রাখতে হবে।
আমার এ লেখা পাঠের পর দেখবেন কেউ-কেউ বলতে আসবে— “তুমি ব্যাটা ইসলামের কী বুঝো?”
—তাদের উদ্দেশ্যে আমার কথা— “তাহলে আপনার ধর্ম কি এতটাই কঠিন যে আমার মতো ন্যুনতম একটা পড়ালেখা জানাওয়ালার পক্ষেও তা বোঝা সম্ভব হচ্ছেনা? আমি বুঝিনা— কিন্তু আপনি ফাইভ পাশ মাতব্বরে ঠিকই বোঝেন?”
তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম আমি ভুল, শফিকুর যা বলেছে সেটাই ঠিক। যদি শফিকুরের কথাগুলোই সঠিক হয়, তাহলে সে ঐ লেখা রিমুভ করে হ্যাকের নাটক সাজালো কেন? তাকে বলুন আগের অবস্থানে ফিরে যেতে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের দ্বিচারিতা আর ভণ্ডামি দেখে অভ্যস্ত।
