নির্বাচনের প্রাক্কালে অন্তর্বর্তী সরকার একের পর এক দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা নিয়ে নীতি ও স্বচ্ছতা প্রশ্নে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের নীতিগত স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় বন্দর খাত। DP World–এর সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে সম্ভাব্য চুক্তি এগোচ্ছে। এর আগে ডেনমার্কের APM Terminals–এর সঙ্গে লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনায় ৩৩ বছরের চুক্তি হয়েছে। সুইস প্রতিষ্ঠান Medlog SA–ও ২২ বছরের জন্য পানগাঁও টার্মিনাল পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সমালোচনা বাড়ছে এই অভিযোগে যে, লালদিয়া ও ডিপি ওয়ার্ল্ড চুক্তিতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র হয়নি। অর্থনীতিবিদদের মতে, মেয়াদের শেষপ্রান্তে এমন অস্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য আর্থিক ও নীতিগত বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিমান খাতেও বড় অঙ্গীকারের ইঙ্গিত মিলছে। রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিসহ Biman Bangladesh Airlines–এর জন্য ১৪টি Boeing উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া দ্রুত এগোচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছাড়া বড় ক্রয়চুক্তি এগোনো নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিরক্ষা খাতে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে প্রায় ৮৫০ একর জমিতে প্রতিরক্ষা শিল্প অঞ্চল গঠনের উদ্যোগও আলোচনায়। এই প্রকল্প বেসরকারি অংশীদারিত্বে এগোনোর পরিকল্পনা থাকলেও, নির্বাচনী বৈধতা ছাড়া এমন কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত—তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো নিয়ে। নবম বেতন কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদরা একে ‘রাজস্ব বোমা’ আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেছেন, এতে দুর্বল রাজস্বভিত্তিক কোষাগারের ওপর বড় চাপ পড়বে।
একই সময়ে একনেকের বৈঠকে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার ২৫টি প্রকল্প অনুমোদন, রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় বড় আকারে বৃদ্ধি, এলএনজি আমদানি চুক্তি, র্যাবের জন্য যানবাহন ক্রয় এবং সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের ভাষায়, এগুলো মিলিয়ে ভবিষ্যৎ সরকারের আর্থিক নীতি নির্ধারণের পরিসর সংকুচিত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতো বিশ্লেষকরা বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল সুষ্ঠু নির্বাচন ও নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অঙ্গীকার নয়। তাদের মতে, এসব সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও অংশীজন পরামর্শের ঘাটতি রয়েছে।
সরকারি মহল বলছে, অর্থনৈতিক গতি ধরে রাখা ও প্রশাসনিক জট এড়াতেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই প্রশ্ন উঠছে এগুলো প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ, নাকি বিদায়ী সময়ের নীতিগত ভার ভবিষ্যতের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া।
