চ্যানেল ১৪ ডেস্ক
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমন নিয়ে শেখ হাসিনার ভূমিকা এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ সংক্রান্ত অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় দাবি করেছেন, তার মা কখনোই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের গুলি করার নির্দেশ দেননি। জয়ের এই দাবিকে পুরোপুরি অযৌক্তিক বলা যায় না বলে মন্তব্য করেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যান।
দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে ডেভিড বার্গম্যান বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শেখ হাসিনার একটি ফাঁস হওয়া ফোনালাপকে কেন্দ্র করে আল–জাজিরা ও বিবিসিতে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোতে বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। ফলে ওই ফোনালাপ থেকে শেখ হাসিনা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে।
ডেভিড বার্গম্যান লেখেন, আলোচিত ফোনালাপটি ১৮ জুলাই রাত আনুমানিক ১০টার দিকে শেখ হাসিনা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের মধ্যে হয়েছিল। কথোপকথনের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন সরকারি ও দলীয় স্থাপনায় হামলার কথা উঠে আসে। তাপস জাতীয় সচিবালয় ও আবাহনী ক্লাবে হামলার তথ্য দেন এবং আরও সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বার্গম্যানের মতে, এই কথোপকথনের মূল প্রেক্ষাপট ছিল অগ্নিসংযোগ ও সম্পত্তিতে সহিংস হামলা। প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমতির ঠিক আগে তাপস শেখ হাসিনাকে জানান, ‘ওরা’ মোহাম্মদপুর থানার দিকে এগোচ্ছে—যা একটি সম্ভাব্য সহিংস হামলার ইঙ্গিত দেয়। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ‘ওরা’ বলতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী নয়, বরং সহিংস হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বোঝানো হচ্ছিল বলেই ধারণা করা যায়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের কথা বলার পরপরই শেখ হাসিনা বলেন, তিনি এর আগে এমন নির্দেশ দেননি, কারণ তিনি ‘ছাত্রদের নিরাপত্তার কথা ভেবে’ নিজেকে সংযত রেখেছিলেন। এতে বোঝা যায়, ওই ফোনালাপে তিনি সচেতনভাবেই ‘ছাত্র’ ও ‘সন্ত্রাসী’—এই দুই শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য করছিলেন।
এই প্রেক্ষাপটে ডেভিড বার্গম্যান বলেন, শুধু এই ফোনালাপটি ধরে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায় না যে শেখ হাসিনা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ কারণেই সজীব ওয়াজেদ জয়ের দাবি—এই অডিও থেকেই গুলির নির্দেশ প্রমাণিত হয় না—পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়।
তবে বার্গম্যান একই সঙ্গে জোর দিয়ে বলেন, একটি ফোনালাপের ব্যাখ্যা দিয়েই পুরো চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের সাক্ষ্য এবং মাঠপর্যায়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রয়োগ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
বার্গম্যান লেখেন, ফোনালাপের বাইরের প্রমাণগুলো শক্তভাবে ইঙ্গিত দেয় যে বাস্তবে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিরাপত্তা বাহিনীর এই কার্যক্রম থামাতে বা সংশোধন করতে শেখ হাসিনা পরবর্তীতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। অভ্যুত্থান দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে শত শত মানুষ নিহত হন বলে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
ডেভিড বার্গম্যান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম নিয়ে লেখালেখি করে আসছেন। অতীতে এসব লেখার সূত্রে তাকে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।
ডেভিড বার্গম্যানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ফোনালাপকে কেন্দ্র করে গুলির নির্দেশ সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়টি একমাত্র ওই অডিওর ভিত্তিতে নয়, বরং বৃহত্তর প্রেক্ষাপট ও বাস্তব ঘটনাপ্রবাহের আলোকে বিচার করা প্রয়োজন।
