বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে সংঘটিত সহিংসতা নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (OHCHR) যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা বাস্তবে সত্য উদ্ঘাটনের দলিল নয় বরং ইউনুস সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই অভিযোগ তুলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন ও বিশদ আইনি পাল্টা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ICRF)। শনিবার ভারতের নয়াদিল্লির প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে আইসিআরএফ, ল’ ভ্যালি সলিসিটর এবং এস শাকির (FRSA)-এর যৌথ উদ্যোগে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের একাধিক সাবেক মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ নেতা উপস্থিত ছিলেন।
আইসিআরএফের লিগ্যাল টিমের প্রধান ব্যারিস্টার ও সলিসিটর নিজুম মজুমদার বলেন, ওএইচসিএইচআর রিপোর্টটি আইনি ও তথ্যগতভাবে গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ।
তার ভাষায়,
“এই প্রতিবেদন প্রমাণের নির্বাচিত ব্যবহার করেছে, যাচাইয়ের স্বচ্ছতা নেই, অভ্যন্তরীণ অসঙ্গতি আছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য উপেক্ষা করা হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করার জন্য যথেষ্ট।”
তিনি অভিযোগ করেন, জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং নিরপেক্ষ সূত্রের সাক্ষাৎকার নেয়নি। বরং পক্ষপাতদুষ্ট ও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ওপর নির্ভর করা হয়েছে। পুলিশ, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী ও সংখ্যালঘুদের ওপর চালানো সহিংসতার বহু প্রমাণ উপেক্ষিত থেকেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাংলাদেশের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন,
“এই রিপোর্ট একতরফা, তড়িঘড়ি তৈরি এবং অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য বাদ দিয়েই চূড়ান্ত করা হয়েছে।”
তিনি জানান, পাঁচ ঘণ্টার ভার্চুয়াল বৈঠকে তিনি পুলিশি বলপ্রয়োগ সংক্রান্ত আইন ও নীতিমালা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করলেও প্রতিবেদনে তার কিছুই প্রতিফলিত হয়নি।
“মনে হয়েছে সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া ছিল। আমাদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কেবল সেই সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার জন্য,”—বলেন তিনি।
নওফেল আরও অভিযোগ করেন, ইউনুস সরকারের ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমের তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা ও আটক রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর অভিযোগকে তিনি কারিগরি দিক থেকে অসম্ভব বলে উল্লেখ করেন।
আওয়ামী লীগের সাবেক প্রতিনিধি রবি আলম বলেন,
“জুলাই–আগস্টের সহিংসতা ছিল সুপরিকল্পিত। নিরীহ মানুষ ও পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছে, স্নাইপার ছিল। অথচ সমস্ত দোষ চাপানো হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর।”
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন,
“ওএইচসিএইচআর-এর এই প্রতিবেদন পক্ষপাতদুষ্ট ও মনগড়া। আইসিআরএফের পাল্টা প্রতিবেদন সেটির শক্তিশালী জবাব।”
তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্র মৃত্যুর ঘটনাকে সামনে এনে শত শত পুলিশ সদস্যের হত্যাকে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হয়েছে। নিহতদের শরীরে পাওয়া গুলির উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে অপসারণের ঘটনাও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পায়নি।
ড. মাহমুদ আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত মৃত্যুর সংখ্যার অসঙ্গতির কথা তুলে ধরে বলেন, সরকারি গেজেটে প্রায় ৮০০ মৃত্যুর উল্লেখ থাকলেও এর মধ্যে দুর্ঘটনা ও অসংলগ্ন ঘটনাও রয়েছে। শতাধিক ব্যক্তি জীবিত ফিরে এসেছেন বলেও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত সহিংসতার দায়ীদের দায়মুক্তি, পুলিশ ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রসঙ্গ ওএইচসিএইচআর ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করেছে।
তার দাবি অনুযায়ী, চার লক্ষাধিক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং লক্ষাধিক এখনও কারাগারে। তিনি এ পরিস্থিতিকে সরাসরি রাজনৈতিক নিপীড়ন বলে আখ্যা দেন।
ড. হাসান মাহমুদ ঘোষণা দেন, ওএইচসিএইচআর প্রতিবেদন ও এর প্রণেতাদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের মহাসচিবসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানানো হবে।
আয়োজকরা স্পষ্ট করে বলেন, এই পাল্টা প্রতিবেদন সহিংসতা অস্বীকার করে না। বরং ইউনুস সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় সত্যের বিকৃতি, তথ্যের অপূর্ণতা ও নির্বাচিত জবাবদিহিতাকে চ্যালেঞ্জ করে একটি পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানায়।
“ন্যায়বিচার রাজনৈতিক সুবিধার হাতিয়ার হতে পারে না তা হতে হবে সত্যনির্ভর ও নিরপেক্ষ,” বলেন তারা।
