রেমিট্যান্সে ভারতের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকলেও বাংলাদেশে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। এমন বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় নতুন করে আরও ২৫২টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স অনুমোদন দিয়েছে, যা নিয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে ২০২৫ সালে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। একই সময়ে বাংলাদেশে এসেছে মাত্র ৩১ বিলিয়ন ডলার। অথচ জনশক্তি রফতানি খাতে ভারতে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ১ হাজার ৯৮৮টি, সেখানে বাংলাদেশে বর্তমানে এ সংখ্যা ২ হাজার ৬৪৬টি।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্র জানায়, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় নতুন করে ২৫২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে লাইসেন্স দিয়েছে। গত বছরের ৪ নভেম্বর মন্ত্রণালয়ের উপসচিবের স্বাক্ষরে এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের তালিকা প্রকাশ করা হয়।
অতীতে দেশে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ৮৫০ থেকে ৯০০-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৩০০-এ। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি তাদের ডিসেম্বর ২০২৪-এর প্রতিবেদনে এজেন্সির সংখ্যা যৌক্তিক মাত্রায় কমিয়ে আনার সুপারিশ করেছিল।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এজেন্সির সংখ্যা কমানোর সুপারিশের সঙ্গে নতুন লাইসেন্স দেওয়া সংগতিপূর্ণ নয়। তাদের মতে, রিক্রুটিং এজেন্সির আধিক্য মানব পাচার, দালাল নির্ভরতা ও আর্থিক অনিয়ম বাড়ায়।
শ্বেতপত্রের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অধিকাংশ রিক্রুটিং এজেন্সির অফিস ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় তারা মাঠপর্যায়ে দালাল বা সাব-এজেন্টের ওপর নির্ভরশীল। এতে স্বচ্ছতার অভাব তৈরি হয় এবং প্রতারণার দায় এজেন্সি ও দালালরা একে অন্যের ওপর চাপিয়ে জবাবদিহিতা এড়িয়ে যায়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত এক দশকে ভিসা বাণিজ্যের নামে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়েছে। এই অর্থের বড় অংশ গেছে রিক্রুটিং এজেন্সি সংশ্লিষ্ট লেনদেন থেকে।
মানব পাচার ও ব্যর্থ অভিবাসন
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শীর্ষে রয়েছে। গত বছর ২২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি অবৈধভাবে ইউরোপে গেছেন, যাদের বড় অংশই দালালচক্রের মাধ্যমে মানব পাচারের শিকার হয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মানব পাচারের অভিযোগে মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৫৪৬টি। আসামি করা হয়েছে ১৯ হাজারের বেশি মানুষকে। তবে সাজা হয়েছে মাত্র ১৫৭ জনের।
সরকার ও বায়রার অবস্থান
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, লাইসেন্স দেওয়ার মাধ্যমে অনেক মধ্যস্বত্বভোগীকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি না হলে কেবল এজেন্সির সংখ্যা বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া বলেন, লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তবে এজেন্সির সংখ্যা বেশি হলে সিন্ডিকেট হওয়ার আশঙ্কা কমে এবং প্রতিযোগিতা বাড়ে বলে তিনি মনে করেন।
এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বক্তব্য জানতে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও গত রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
