জুলাইয়ের তথাকথিত আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন গভীর গৃহদাহে জর্জরিত। দলটির ভেতরে চলমান এই সংকট ক্রমেই ভাঙনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট ও আসন সমঝোতা নিয়ে বিতর্কের জেরে এরই মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা পদত্যাগ করেছেন। সামনে আরও পদত্যাগের আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
এনসিপির অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ার পর থেকেই দলের মধ্যে বিভক্তি তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে যেসব নেতা দলটির আদর্শিক অবস্থান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তারাই একে একে সরে দাঁড়াচ্ছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা অনিক রায়, তুহিন খান ও অলিক মৃ দল ছাড়েন। জামায়াতের সঙ্গে আসন বণ্টনের আলোচনা শুরুর পর পদত্যাগ করেন যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক এবং পরে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা। এই দুজনকেই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছিল এনসিপি। তাঁদের পদত্যাগের পর দলটির ভেতরে অস্বস্তি আরও বেড়েছে।
গত বছর শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের হাত ধরেই ফেব্রুয়ারিতে এনসিপির আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরে শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন আদায় করে দলটি। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই আসন সমঝোতা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে দেন-দরবারে নামায় এনসিপি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতের প্রতিই দলটির ঝোঁক বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা দলের ভেতরে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
এনসিপির বিরুদ্ধে শুরু থেকেই জামায়াতের ‘বি টিম’ হওয়ার অভিযোগ ছিল। আন্দোলনের সময় নেতৃত্বে থাকা অনেকেই যে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেই অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে। এনসিপির ভেতরেও এমন লোক এখনও সক্রিয় আছেন বলে দাবি করছেন সমালোচকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ সাহান মনে করেন, এনসিপি আসলে ভোটের হিসাব কষছে। তাঁর ভাষায়, “তারা দেখছে কোন জায়গা থেকে বেশি আসন পাওয়া যাবে। সেই হিসাবে জামায়াতের দিকেই তাদের ঝোঁক।” তাঁর মতে, জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতায় গেলে এনসিপির বিরুদ্ধে ওঠা ‘বি টিম’ অভিযোগই প্রতিষ্ঠিত হবে।
এদিকে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত ৩০ জন সদস্য জামায়াতের সঙ্গে সম্ভাব্য জোটের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন। তারা দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে স্মারকলিপি দিয়ে জানিয়েছেন, জামায়াতের সঙ্গে কোনো ধরনের জোট এনসিপির রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করবে। স্মারকলিপিতে ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির কাছ থেকে প্রত্যাশিত আসন ছাড় না পাওয়াতেই এনসিপি জামায়াতমুখী হচ্ছে। যদিও দলের শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন, আসন জেতাই তাদের মূল লক্ষ্য নয়। তবে কথা ও কাজের এই অসামঞ্জস্যই দলটির ভেতরে আস্থার সংকট বাড়াচ্ছে।
ফেব্রুয়ারিতে আত্মপ্রকাশের সময় যে উৎসাহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা ফিকে হয়ে এসেছে। ভিন্ন মত ও ভিন্ন পথের মানুষদের নিয়ে গঠিত এনসিপি এখন আদর্শিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে। জামায়াতের দিকে ঝোঁকার এই রাজনীতি দলটিকে কোথায় নিয়ে যাবে সে প্রশ্নই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
