নিজস্ব প্রতিনিধিঃ একসময় আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কৃষিবিদ সীডের চেয়ারম্যান এবং কৃষিবিদ গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ড. মো. আলী আফজাল এখন জামায়াতের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায়। ৫ আগস্টের আগে তাকে নিয়মিত দেখা যেত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং সৌজন্য সাক্ষাতে। তিনি নিজেই এসব ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করতেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছ থেকে ফুল পেয়ে তোলা ছবিও ছিল তার সাম্প্রতিক সময়ের প্রচারের অংশ। মুজিব কোট পরে টকশোতে অংশ নিয়ে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীদের নিয়ে ইতিবাচক বক্তব্য দিতেন।
৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। এখন তিনি নিয়মিত দেখা দিচ্ছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে। সৌজন্য সাক্ষাৎ, অনুষ্ঠান, সেমিনার, নবীন বরণ বা সম্মাননা—সব ক্ষেত্রেই তাকে দেখা যাচ্ছে জামায়াত বা ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতাদের সান্নিধ্যে। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব ছবিও নিজেই পোস্ট করছেন তিনি। মাগুরায় নিজ এলাকায় জনসংযোগও নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছেন।
আলী আফজালকে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে দেখা গেছে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরোয়ার এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইলাম বুলবুলের সঙ্গে। ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম ও কেন্দ্রীয় অফিস সম্পাদক সিবাগাতুল্লাহ সিবগাও উপহার নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন। পায়ে আঘাতের পর তাকে দেখতে গেছেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও মিয়া গোলাম পরোয়ার।
শিক্ষাঙ্গনেও উপস্থিতি বাড়ছে তার। শিবিরের শেরে বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নবীন বরণে তিনি অতিথি ছিলেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শিবির আয়োজিত মেরিট অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ২৮ অক্টোবর। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি পশ্চিম শাখার উদ্যোগে ১৩ নভেম্বর আয়েজিত ISMAIL AL-ZAZARI ROBOTICS FEST-2025 অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন তিনি।
জানা গেছে তিনি মাগুরা-২ আসন থেকে জামায়াতের মনোনয়ন চান। সে লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে নিয়মিত রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।
এদিকে তার এই রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন এবং ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার এলাকার বাসিন্দা, কৃষিবিদ এবং বিভিন্ন বিনিয়োগকারী। তাদের অভিযোগ—আলী আফজাল বিভিন্ন কোম্পানি ও সমবায় সমিতি গড়ে আকর্ষণীয় মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শত শত কৃষিবিদের কাছ থেকে বিনিয়োগ নিয়েছেন। কিন্তু এখন লাভ বা মূলধন কোনোটাই ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি ব্যাংক থেকে নেওয়া শত কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ না করা এবং লোকসানি কোম্পানিকে লাভজনক দেখিয়ে শেয়ারবাজার থেকে টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
একজন ভুক্তভোগী বলেন, “উনি আকর্ষণীয় মুনাফার লোভ দেখিয়ে ২৬ কোম্পানি ও সমবায় সমিতি করে শত শত কৃষিবিদের কাছ থেকে বিনিয়োগ নিয়েছে। এখন প্রফিট মূল বিনিয়োগ কিছুই ফেরত দিচ্ছে না, ফোন করলে ফোন ধরেন না। আইনগতভাবে বা মিডিয়ায় কথা বললে কিছুই না দেওয়ার হুমকি দেন।”
তিনি আরও বলেন, “আলী আফজাল সমিতির প্লট ফ্ল্যাট বিক্রি করে টাকা নিয়েছেন কিন্ত যারা বিনিয়োগকারী তাদেরকে প্লট ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিচ্ছে না। বছরের পর বছর ধরে ঘুরাচ্ছেন। ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা লোন নিয়েছেন উনি, যার অধিকাংশই খেলাপী। এছাড়াও তিনি লোকসানী কোম্পানিকে লাভজনক দেখিয়ে শেয়ার মার্কেট থেকে টাকা আত্মসাৎ করেছেন।”
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, “২০১১ সালে কৃষিবিদ গ্রুপের এপার্টমেন্ট বুকিং দিয়েছিলাম। মিরপুরে চিড়িয়াখানার পাশে তারা এপার্টমেন্ট করবে। পরে শুনি ওই স্থানে আর এপার্টমেন্ট হয়নি। পরে আমি কষ্ট করে ওদের কাছ থেকে একটা এপার্টমেন্ট নিই টপফ্লোরে। পাশাপাশি তাদের কাছে একটা জমিও নিয়েছিলাম। ২০১১ সালে ৩ কাঠা জমি ২১ লাখ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম। যেটা এখন পর্যন্ত খতিয়ান বা এটাই যে আমার জমি এটা নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা আছে।”
তিনি যোগ করেন, “যারা শেয়ার কিনেছি তারা খুবই মনক্ষুন্ন। তারা প্রফিট ডিক্লেয়ার করে না ঠিকমত। আমি একটা শেয়ার কিনেছিলাম ২০১৬ সালে। এখন জানি না আমার শেয়ার আছে কিনা। কত টাকা আছে সেটাও ক্লিয়ার না। তারা জুমে এজিএম করে। কিছু লিস্টেড লোক বাহবা দেয়। সর্বশেষ শুনেছি তারা দশমিক ৫ শতাংশ প্রফিট ডিক্লেয়ার করেছে। এটা কখনো হয়?”
তিনি আরও বলেন, “আমি যে এপার্টমেন্ট কিনেছি, গ্যাসের লাইনটাইন বুঝিয়ে দেননি। এখনো কিছু কাগজপত্রের ঘাটতি আছে। আমরা সীমিত আয় থেকে সেভ করে এগুলার পেছনে দিয়েছি। এখন টাকাগুলো ফেরত পাব কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে।”
অভিযোগের বিষয়ে আলী আফজালের তিনটি মুঠোফোন নাম্বারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নাম্বারগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
