বিতর্কিত ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪’-এর ‘নীরব’ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সব ধরনের ‘কালো আইন’ বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারে এলেও, এই আইনের প্রয়োগ থামেনি। সম্প্রতি মিস আর্থ বাংলাদেশ-২০২০ বিজয়ী মডেল মেঘনা আলমকে জোরপূর্বক আটক করার ঘটনা সামনে এলেও, দ্য সান ২৪-এর হাতে আসা নথি অনুযায়ী, এই আইনের প্রয়োগ আরও আগে থেকেই চলছে।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে আটকাদেশের ক্ষেত্রে ‘নীরবে’ এই আইন ব্যবহৃত হচ্ছে।
নথিতে আটকাদেশ বৃদ্ধির প্রমাণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের রাজনৈতিক শাখা-২ কর্তৃক গত ৮ এপ্রিল জারি করা এক আদেশে দেখা গেছে, বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৩ (১) ধারার ক্ষমতাবলে চারজনের আটকাদেশ বর্ধিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী ক্ষতিকারক কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য এই আটকাদেশ বাড়ানো হলো।
আটকাদেশ বর্ধিত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন:
- রেখা আলম চৌধুরী: চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক নারী কাউন্সিলর। কোনো মামলা ছাড়াই বিশেষ ক্ষমতা আইনে তাকে কারাবন্দি করে রাখা হয়েছে। তার আটকাদেশের মেয়াদ দ্বিতীয় দফায় ১০ এপ্রিল থেকে পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো হয়েছে।
- মশিউর রহমান: বাংলাদেশ পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি)। গত ১৯ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হওয়ার পর তারও আটকাদেশের মেয়াদ ১০ এপ্রিল থেকে ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো হয়।
- জিন্নাত সুলতানা ঝুমা (৩৫): চট্টগ্রাম মহানগর যুব মহিলা লীগের সদস্য।
- দস্তগীর আহমদ সুমন (৪৭): চট্টগ্রামের হালিশহরের বাসিন্দা।
নথি থেকে এটি স্পষ্ট যে মডেল মেঘনা আলমের আটকের অনেক আগে থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার এই আইনের প্রয়োগ করে আসছে।
আলোচনায় মেঘনা আলম ও হাইকোর্টের রুল গত বুধবার রাতে মডেল মেঘনা আলমকে আটক করে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৩(১) ধারায় ৩০ দিনের আটকাদেশ দেওয়া হয়। এই ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও মন্তব্য করেন যে ‘বিষয়টি সঠিক হয়নি’। এদিকে, এই আটকাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রুল জারি করেছে।
আন্তর্জাতিক ও আইনি মহলের উদ্বেগ এই দমনমূলক আইনের ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানায়, অতীতে এই আইন অস্পষ্ট ও অতিরিক্ত বিস্তৃত বিধানের মাধ্যমে আদালতের নজরদারি ছাড়াই স্বেচ্ছাচারভাবে মানুষকে আটক করতে ব্যবহৃত হয়েছে। অ্যামনেস্টি এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মান ও সর্বোত্তম চর্চার চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান এই আইনের অপপ্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, এটি সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকার’-এর পরিপন্থী এবং বিচারবহির্ভূতভাবে ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করে। তিনি সিএমএম আদালতের এই ধরনের আটকাদেশের অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
