ফোরটিন ডেস্ক : বাংলাদেশে আইনের শাসনের চরম অবনতি, উগ্রবাদী গোষ্ঠীর বিপজ্জনক পুনরুত্থান এবং নির্বিচার রাজনৈতিক নিপীড়নের চিত্র আন্তর্জাতিক মহলের সামনে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কিতে ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নেন্স’ আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগসহ সাধারণ মানুষকে মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে শেখ হাসিনা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের সময়ে মানবাধিকারের চরম বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে দেশে ২৫৩ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৫৪ জনই শিশু এবং ধর্ষণের পর ১২ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। টিকাদান কর্মসূচি ভেঙে পড়ায় মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। গত দুই বছরে শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, চাঁদাবাজি ও নির্যাতনে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এমনকি নিজ প্রতিষ্ঠানে চুরির প্রতিবাদ করায় একজন নারী উদ্যোক্তাকে জেলে পাঠানোর দৃষ্টান্ত তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন করেন, এটি কেমন গণতন্ত্র?
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঐতিহাসিক অর্জনগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, তাঁর সরকার দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশ থেকে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছিল, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছিল এবং প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে গিয়েছিল। পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদন ও ২০১৭ সালে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল বাংলাদেশ। এছাড়া সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণে দেশ নিরাপদ ছিল। কিন্তু আজ উগ্রবাদী চক্রগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, আর অভিজ্ঞ সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকর্তাদের অন্যায়ভাবে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে; যা গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনা নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে চলা অপপ্রচারের কড়া জবাব দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তাঁর বিকৃত ছবি তৈরি এবং পরিকল্পিত গুজবের মাধ্যমে তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তিনি কখনোই নিরীহ মানুষের ওপর গুলির নির্দেশ দেননি। সত্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে তিনিই ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই হাইকোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে এবং পরবর্তীতে ১ আগস্ট তিন সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই সেই নিরপেক্ষ তদন্ত বন্ধ করে দেন। তদন্ত কমিশন বন্ধ করে একদিকে আন্দোলনকারীদের আইনি দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ঢালাও মিথ্যা হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। ড. ইউনূসের নিজের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, আন্দোলনটি যদি ‘নিখুঁত পরিকল্পনার অংশ’ হয়ে থাকে, তবে সত্য বের করতে তদন্ত বন্ধ করা হলো কেন?
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পুরো পরিবার হারানোর বেদনার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, স্বজন হারানোর বেদনা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। নিজের জীবন বাজি রেখেও তিনি সবসময় এ দেশের মানুষের পাশে ছিলেন এবং থাকবেন। হেলসিঙ্কির এই মঞ্চ থেকে তিনি জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক নিপীড়ন বন্ধ, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, আওয়ামী লীগের ওপর থেকে অগণতান্ত্রিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবিলম্বে ফিরিয়ে আনতে হবে।
