বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা : দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ ও রাজপথের বিক্ষোভ দিন দিন কেন আরও জটিল এবং সহিংস সংঘাতের দিকে মোড় নিচ্ছে—তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে গভীর সংবাদ বিশ্লেষণ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামের মুখে সাধারণ শ্রমিকদের বেঁচে থাকার দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কার্যকর নেতৃত্বের অভাব, রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ, মালিক-শ্রমিক আস্থার ঘাটতি এবং নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত দুর্বলতা।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তৈরি পোশাক খাতের এই অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার প্রধান একটি কারণ একটি গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন কিংবা দায়িত্বশীল দরকষাকষি প্রতিনিধির (সিবিএ) অনুপস্থিতি। অতীতে অন্যান্য ভারী শিল্প খাতে প্রতিনিধিত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন থাকায় সরকার ও মালিকপক্ষের সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিক টেবিল বৈঠকের সুযোগ থাকত। কিন্তু তৈরি পোশাক খাতের বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের প্রাতিষ্ঠানিক ও গ্রহণযোগ্য কোনো একক নেতৃত্ব না থাকায় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় এই ক্ষোভ দ্রুত বিশৃঙ্খলায় রূপ নিচ্ছে এবং সুযোগসন্ধানী মহলের অনুপ্রবেশে সহিংসতা ও নাশকতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একই সঙ্গে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ইন্ধনের বিতর্ক পুরো পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে দাবি করা হচ্ছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক শক্তি ও তাদের সহযোগীরা শিল্প খাতকে অস্থিতিশীল করে ফায়দা লোটার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, কারখানা মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-এর নেতৃত্বও এই আন্দোলনকে নিছক মজুরি বৃদ্ধির দাবি হিসেবে না দেখে এর পেছনে গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছে। ফলে মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থার চরম সংকট তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সময়োচিত নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঘাটতি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলেও দেশের মূল উৎপাদন খাতের বেসরকারি শ্রমিকদের চরম মূল্যস্ফীতির বাস্তবতাকে যথাসময়ে নীতিগতভাবে আমলে নেওয়া হয়নি। সংকট তীব্র আকার ধারণ করার আগে কার্যকর মজুরি বোর্ড গঠন কিংবা ত্রিপক্ষীয় আলোচনার উদ্যোগ না নেওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে চরম বৈষম্যবোধ ও চাপা ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। সামগ্রিকভাবে, অর্থনৈতিক বঞ্চনার বাস্তবতার সঙ্গে নানামুখী স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাব এবং সময়োপযোগী প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার অভাবেই পোশাক খাতের চলমান অসন্তোষ সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
