ফোরটিন ডেস্ক : একাত্তরের ২৫ জুলাই শেরপুরের নালিতাবাড়ীর সোহাগপুর গ্রামে আলবদর ও পাকিস্তানি হানাদাররা মিলে ১৮৭ জন পুরুষকে হত্যা আর নারীদের পাশবিক নির্যাতন করার পর সেদিন লাশের স্তূপ সৎকার করার মতো কোনো পুরুষ বেঁচে ছিল না।
স্বামী ও স্বজনহারা নারীরাই ছেঁড়া শাড়ি আর কলাপাতা জড়িয়ে চোখের জলে মাটিচাপা দিয়েছিলেন স্বজনদের; জন্ম হয়েছিল ‘বিধবাপল্লী’র। অর্ধশতক পেরিয়ে ২০২৬ সালে এসে পিরোজপুরের মাটিতে যেন ফিরে এলো সেই একই বর্বরোচিত ইতিহাসের ছায়া।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া এক বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তাঁর দাফনে বাধা দেয় স্থানীয় জামায়াত চক্র। শেষ পর্যন্ত রাতের অন্ধকারে মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে নিভৃতে সেই মুক্তিযোদ্ধার কবর খুঁড়তে বাধ্য হয়েছেন তাঁর স্ত্রী ও দুই বোন।
পিরোজপুরের সেই তিন নারীর কোদাল হাতে মাটি কাটার দৃশ্য এখন দেশজুড়ে বিবেকবান মানুষকে নাড়া দিচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, সাঈদীর মামলার সাক্ষী হওয়ায় ওই বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি স্থানীয় জামায়াত নেতাদের ক্ষোভ ছিল দীর্ঘদিনের।
মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ দাফনের জন্য কবর খোঁড়া তো দূরের কথা, কোনো পুরুষ মানুষকে জানাজা বা সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে দেওয়া হয়নি। চরম নিরাপত্তাহীনতা আর হুমকির মুখে কোনো উপায় না পেয়ে তিন নারী নিজেরাই কোদাল তুলে নেন এবং মোবাইলের আলোয় আধখোড়া কবরে অশ্রুসিক্ত চোখে চিরনিদ্রায় শায়িত করেন রণাঙ্গনের বীর সন্তানকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাস সচেতন মহলের মতে, এই ঘটনাটি একাত্তরে জামায়াত-আলবদরের সেই পুরোনো প্রতিহিংসামূলক মানসিকতারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। শেরপুরের সোহাগপুরে যে আলবদর বাহিনীর নেতৃত্বে নারীদের বিধবা করে কবর খুঁড়তে বাধ্য করা হয়েছিল, তাদেরই নেতা কামারুজ্জামানের বিচার এই বাংলার মাটিতে হয়েছে। অথচ আজ নতুন করে সেই অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়কেও বিষাক্ত করে তুলেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রগতিশীল সমাজ ও সাধারণ নাগরিকরা। বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে, একাত্তরের রক্তাক্ত ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন দেশে একজন মুক্তিযোদ্ধার কবরে এমন প্রতিহিংসামূলক থাবা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
পিরোজপুরে তিন নারীর অশ্রুভেজা কবর খোঁড়ার এই দৃশ্য জামায়াত-শিবিরের প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতিকে জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এবং এই প্রতিবাদী দৃশ্যই হয়তো দেশের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন প্রতিরোধের ইতিহাস তৈরি করবে।
