ফোরটিন ডেস্ক : রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, ফুটপাত, হাসপাতালের গেট কিংবা কোনো নির্জন স্থান। প্রতিদিন মানুষের ভিড়ে মুখর এই শহরের কোথাও না কোথাও পড়ে থাকছে এমন মরদেহ, যার পাশে নেই পরিচিত কোনো মুখ। মৃত্যুর পরও জানা যাচ্ছে না নাম, পরিচয় কিংবা ঠিকানা। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করছে, ময়নাতদন্ত হচ্ছে, পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। কিন্তু স্বজনের দেখা না মিললে শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটির পরিচয় দাঁড়াচ্ছে শুধু একটি শব্দে, ‘অজ্ঞাত’।
এরপর শুরু হয় আরেক অপেক্ষা। মর্গে পড়ে থাকা সেই মরদেহের খোঁজে কেউ আসবে কি না। কোনো পরিবার নিখোঁজ স্বজনের ছবি দেখে তাকে চিনতে পারবে কি না। কিন্তু সেই অপেক্ষারও শেষ আছে। আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে পরিচয়হীন মরদেহ চলে যায় বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের পথে। রাজধানীতে যার শেষ ঠিকানাগুলোর একটি জুরাইন কবরস্থান।
ডিএমপির প্রকাশ্য নথি ও বিভিন্ন থানার তথ্য বলছে, চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর একাধিক এলাকায় অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। পূর্ণাঙ্গ আট মাসের সমন্বিত সংখ্যা প্রকাশ না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু মে ও আগস্টেই শাহবাগ থানার অধীনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে দুটি অজ্ঞাত নারী মরদেহের পরিচয় শনাক্তে পুলিশের পক্ষ থেকে জনসাধারণের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। মে মাসে উদ্ধার হওয়া নারীর বয়স আনুমানিক ৫৫ বছর। আর ১২ আগস্ট উদ্ধার হওয়া কিশোরীর বয়স আনুমানিক ১৫ বছর।
শাহবাগে পরিচয়হীন মৃত্যুর ছাপ
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকা হওয়ায় শাহবাগে অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা বেশি দৃশ্যমান। অসুস্থ বা ভবঘুরে মানুষের মৃত্যু, স্বজনের রেখে যাওয়া মরদেহ কিংবা দুর্ঘটনায় পরিচয়হীন ব্যক্তির লাশ, বিভিন্ন কারণে পুলিশকে এসব মরদেহের পরিচয় শনাক্তে কাজ করতে হয়।
১২ আগস্টের ঘটনাটি সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। পরিবারের লোকজন ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে মৃত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগের সামনে নিয়ে আসে। তাকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার সময় পরিবারের লোকজন সরে যায়। পরে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
পরিচয় শনাক্তে সহায়তা চেয়ে পুলিশ বিজ্ঞপ্তি দেয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, যে পরিবার কিশোরীকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল, তারা কোথায় গেল? তারা কি জানে, তার মরদেহ এখন কোথায়?
মর্গ থেকে জুরাইনের কবর
অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের পর প্রথমে পুলিশ সুরতহাল করে। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয় মর্গে। পরিচয় শনাক্তের জন্য ছবি, পোশাক, শারীরিক বৈশিষ্ট্যসহ বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। প্রয়োজন হলে ডিএনএ নমুনাও সংগ্রহ করা হয়।
এরপর শুরু হয় অপেক্ষা। স্বজন আসবে, কেউ নিখোঁজের খবর নিয়ে মরদেহ শনাক্ত করবে, এমন প্রত্যাশায় মরদেহ পড়ে থাকে মর্গে।
কিন্তু দিনের পর দিন অপেক্ষার পরও যদি পরিচয় না মেলে, তখন আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের দায়িত্ব নেয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। কাফন, জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। রাজধানীতে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের ক্ষেত্রে জুরাইন কবরস্থান হয়ে ওঠে শেষ ঠিকানা।
অর্থাৎ একজন মানুষের শেষ যাত্রা শুরু হয় পুলিশের উদ্ধার দিয়ে, এরপর মর্গে অপেক্ষা, আর শেষ হয় এমন এক কবরে, যেখানে হয়তো কোনোদিনও তার নাম লেখা হবে না।
দাফনের পরও থেকে যায় প্রশ্ন
সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয় দাফনের পর। কোনো পরিবার যদি পরে নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান পায়, তখন পরিচয় শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
অতীতে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা মরদেহের পরিচয় পরে শনাক্ত করার ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি রায়েরবাজারে দাফন করা মরদেহের ক্ষেত্রে কবর শনাক্তকরণ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তাই মর্গে থাকা অজ্ঞাত মরদেহের তথ্য শুধু একটি থানার নথিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একজন মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার হয়তো থানায় খোঁজ করছে। একই সময়ে কোনো হাসপাতালে বা মর্গে হয়তো পড়ে আছে পরিচয়হীন একটি মরদেহ। কিন্তু এই দুই তথ্যের মধ্যে সমন্বয় না হলে সেই মানুষটির পরিচয় হয়তো দাফনের পরও অজানাই থেকে যাবে।
পুলিশের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্তে থানাগুলো নিয়মিত ছবি ও বর্ণনা প্রকাশ করছে। স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষার সহায়তা নেওয়া হয়।
অনেক ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তি ভবঘুরে, অসুস্থ কিংবা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় পরিচয় শনাক্তে সময় লাগে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, নিখোঁজ ব্যক্তির তালিকা, হাসপাতালের মর্গ, থানা এবং ডিএনএ তথ্য যদি একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার আওতায় আনা যায়, তাহলে পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা সম্ভব কি না।
কারণ একটি অজ্ঞাত লাশ শুধু একটি মরদেহ নয়। তার পেছনে থাকতে পারে কোনো পরিবারের অপেক্ষা, কোনো মায়ের সন্তান হারানোর কষ্ট, কোনো সন্তানের বাবাকে খুঁজে ফেরার আকুতি কিংবা কোনো স্বজনের দীর্ঘদিনের অপেক্ষা।
