বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার নাম গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচিত। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে সক্রিয়ভাবে জাতীয় রাজনীতিতে ফেরার পর থেকে দলটির নেতৃত্বে তিনি দীর্ঘ সময় বিরোধী রাজনীতি করেছেন, দুই দফায় প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এবং ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ১৫ বছরের বেশি সময় সরকার পরিচালনা করেছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে তাঁর সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটে।
১৯৮১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই সময়ে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, নির্বাচন, সরকার পরিবর্তন, বিরোধী দলীয় রাজনীতি, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায় থাকা এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পতন, সবই ঘটেছে তাঁর নেতৃত্বকে ঘিরে।
১৯৮১: আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার সময় শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা দেশের বাইরে ছিলেন। এরপর কয়েক বছর নির্বাসনে থাকার পর শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ফেরার রাজনৈতিক পথ তৈরি করেন।
১৯৮১ সালে তাঁর অনুপস্থিতিতেই তাঁকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। একই বছরের ১৭ মে তিনি দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করে তিনি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
এরপরের দশকে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করা এবং তৎকালীন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনে শেখ হাসিনার ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও বিরোধী রাজনীতি
১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল সামরিক শাসন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আন্দোলনে যুক্ত হয়।
১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়। এরপর ১৯৮৮ সালের নির্বাচন বর্জন করে দলটি। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন অব্যাহত থাকে এবং ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনের অবসান ঘটে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করতে পারেনি। বিএনপি সরকার গঠন করলে শেখ হাসিনা সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব নেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক সময়টি ছিল তাঁর জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের প্রধান নেত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৯৬: প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী
১৯৯৬ সালের ১২ জুনের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। ২৩ জুন শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
তাঁর প্রথম মেয়াদে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও পানি রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে ওঠে। ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এই মেয়াদে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। তবে পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয় এবং শেখ হাসিনা আবার বিরোধী দলের নেত্রী হন।
২০০১ থেকে ২০০৮: বিরোধী রাজনীতি ও ক্ষমতায় ফেরার প্রস্তুতি
২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে। শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতৃত্বে ফিরে যান।
এই সময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা অব্যাহত থাকে। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলার ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় সহিংস ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।
২০০৬-০৮ সালের রাজনৈতিক সংকট, জরুরি অবস্থা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
২০০৯: দীর্ঘ দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরু
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনের পরও তিনি সরকার গঠন করেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়টিই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ক্ষমতাকেন্দ্রিক অধ্যায়। এই সময়ে তাঁর সরকার বাংলাদেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, ডিজিটাল সেবা ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন প্রকল্পে জোর দেয়।
উন্নয়ন ও অবকাঠামোর অধ্যায়
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ওঠে। তৈরি পোশাক রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে অর্থনীতির আকারও বড় হয়।
এই সময়ে পদ্মা সেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর সরকারের সময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশংসা করা হলেও একই সঙ্গে আয়বৈষম্য, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাত ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক বিতর্ক
শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে ওঠে নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দলের বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ভোট কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনেও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশ নেয়নি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ আবারও সরকার গঠন করে এবং তিনি পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ ওই নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা তোলে।
দীর্ঘ শাসনের পাশাপাশি মানবাধিকার নিয়ে সমালোচনা
শেখ হাসিনার সরকারের সময় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী দলের ওপর চাপ, গ্রেপ্তার, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব ও এর কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর মানবাধিকার-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা দেয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী মত দমন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করে এসেছে।
সরকার অবশ্য বিভিন্ন সময়ে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমনে কঠোর অবস্থানকে নিজেদের অন্যতম সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে।
২০২৪: ক্ষমতার শেষ অধ্যায়
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনটি বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।
সহিংসতা, প্রাণহানি এবং সরকারের পদত্যাগের দাবিতে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন এবং ভারতে চলে যান। একই দিন আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে প্রবেশ করে।
এর পরদিন ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করার ঘোষণা আসে। ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।
এর মধ্য দিয়ে ২০০৯ সালে শুরু হওয়া শেখ হাসিনার টানা প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটে।
২০২৪ থেকে ২০২৬: ক্ষমতার বাইরে শেখ হাসিনা
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে বিভিন্ন মামলা ও রাজনৈতিক-আইনি কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
২০২৫ ও ২০২৬ সালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ভূমিকা, দলের কার্যক্রম এবং শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। তাঁর দীর্ঘ শাসনের মূল্যায়নও দুই বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিভক্ত।
সমর্থকদের কাছে শেখ হাসিনা উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের নেতা। সমালোচকদের কাছে তাঁর শাসন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সংকুচিত করা, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত।
পাঁচ দশকের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ থেকে ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান পর্যন্ত শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর একজন ছিলেন। প্রায় চার দশক তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্ব ছিল ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত; এরপর ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাই একমাত্রিক নয়। বাংলাদেশের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যেমন তাঁর নাম যুক্ত, তেমনি নির্বাচন, বিরোধী রাজনীতি, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন নিয়েও রয়েছে দীর্ঘ বিতর্ক।
২০২৬ সালে এসে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অধ্যায় এখন আর শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জীবনী নয়। এটি বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের রাজনৈতিক পরিবর্তন, ক্ষমতার পালাবদল এবং আওয়ামী লীগের উত্থান-পতনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত একটি অধ্যায়।
