নিজস্ব প্রতিবেদক: সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য, টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন এবং বিদেশে অর্থপাচার।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুদক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।
দুদক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগে উল্লেখ করা বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের অঙ্ক যোগ করলে মোট পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। অনুসন্ধানের মাধ্যমে অভিযোগগুলো যাচাই করবে দুদক।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। ওই অনুসন্ধানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, কেনাকাটা ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, আগের অভিযোগের সঙ্গে নতুন অভিযোগগুলো যুক্ত করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ডিসি পদায়ন ও সিটি করপোরেশন নিয়ে অভিযোগ
অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেনের দাবি করা হয়েছে। এছাড়া দেশের ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখিত অঙ্ক অনুযায়ী, ৩৬ জনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য লেনদেনের পরিমাণ ৭২ কোটি থেকে ৩৬০ কোটি টাকা হতে পারে। এসব অভিযোগও অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করবে দুদক।
এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গে আসিফ মাহমুদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ
অভিযোগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের দাবি করা হয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়া আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং সেই অর্থ গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগ করা হয়েছে।
নিয়োগে ঘুষের অভিযোগ
অভিযোগে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগে ১০ কোটি টাকা উৎকোচ নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।
এলজিইডির সাবেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সিইও হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
এছাড়া যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতেও কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
চার দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
দুদকে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, চার দেশে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এসব অর্থ দিয়ে বিভিন্ন দেশে ভিলা কেনা ও ব্যবসায় বিনিয়োগের দাবিও করা হয়েছে।
এছাড়া পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আসিফ মাহমুদের দুই বোনের স্বামী ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে অর্থপাচারের দাবিও করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
পরিবারের সদস্য ও সহযোগীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
অভিযোগে আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন এবং এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধেও ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে।
তাঁর পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া হেলিকপ্টারে কম্বল বিতরণে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় এবং বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থানে গুলিভর্তি ব্যাগ নিয়ে প্রবেশের ঘটনাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাশাপাশি পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গাড়ি ব্যবহারের বিষয়েও অভিযোগ তোলা হয়েছে।
আগের অনুসন্ধানে যেসব অভিযোগ ছিল
এর আগে আসিফ মাহমুদসহ সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্মসচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
ওই অনুসন্ধানে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল ও পদায়নের মাধ্যমে ৭৬ লাখ টাকা, ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের জায়গায় পদায়নের জন্য ২ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগের কথা বলা হয়।
এছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের টেন্ডার, কেনাকাটা ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
নতুন অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। একাধিক মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ-পদায়ন এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ এখন অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করবে দুদক।
