নিজস্ব প্রতিবেদক : ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়ছেন পটুয়াখালী সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমান (৪৮)। অথচ সম্পূর্ণ প্যারালাইজড ও অচেতন অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা এই রোগীর ডান হাতে ঝুলছে মোটা দড়িসহ হাতকড়া। লাইফ সাপোর্টে থাকা একজন রোগীর হাতে এক মাস ধরে হাতকড়া পরিয়ে রাখার ঘটনাকে চরম ‘অমানবিক’ বলে মন্তব্য করেছেন দায়িত্বরত চিকিৎসকেরা।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দেখা যায়, ঢামেকের আইসিইউতে শয্যাশায়ী মিজানুর রহমানের গলায় ট্র্যাকিওস্টোমি টিউব এবং নাকে রাইলস টিউব লাগানো। অসাড় ডান হাতটিতে অক্সিজেনের মাত্রামাপক অক্সিমিটার লাগানো থাকলেও তার ঠিক পাশেই পরানো রয়েছে শক্ত হাতকড়া।
মিজানুর রহমানের পরিবার জানায়, গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি হত্যা মামলায় তাকে সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরবর্তীতে কাশিমপুর কারাগারে থাকা অবস্থাতেই একের পর এক নতুন মামলায় তাঁকে ‘অ্যারেস্ট শোনানো’ হয়। গত ৯ জুন কারাগারে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে প্রথমে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে পর্যায়ক্রমে নিউরোসাইন্সেস হাসপাতাল হয়ে ঢামেকের আইসিইউতে আনা হয়। গত ১৪ জুন থেকে তিনি আইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন এবং ভর্তির দুই দিন পর থেকেই তাকে সম্পূর্ণ লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।
হাসপাতালের আইসিইউর সামনে টানা অবস্থানরত মিজানুর রহমানের মা মাতোয়ারা বেগম কেঁদে কেঁদে বলেন, “হাসপাতালে ভর্তির পর দুই দিন খালি ‘ও-মা’ বলে ডাকছে। তারপর ছেলের আর কোনো খেয়ালই নাই। সম্পূর্ণ শরীরটাই তো প্যারালাইজড, মাকেও আর চেনে না।” মিজানুরের স্ত্রী সালমা জাহানের অভিযোগ, শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও পুলিশ সদস্যরা ‘নিয়মের অজুহাত’ দিয়ে এক মাস ধরে হাতকড়া খোলেননি। পরবর্তীতে অবস্থা অতিসংকটপন্ন হলে চিকিৎসকদের চাপে গত সপ্তাহে তা খোলা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢামেকের একাধিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আইসিইউতে থাকা একজন রোগী যার বাঁচার আশঙ্কাই ক্ষীণ, তিনি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যাবেন—এমন ভাবনা অবিশ্বাস্য। আইসিইউর চিকিৎসায় ক্যানুলা লাগানোসহ জীবাণুমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি। হাতকড়ার নোংরা দড়ি ও ধাতব অংশ ইনফেকশনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, “অসুস্থ কোনো ব্যক্তির হাতে হাতকড়া থাকা আমরাও প্রত্যাশা করি না। নিরাপত্তার স্বার্থে দায়িত্বরতরা অনেক সময় দ্বিধায় থাকেন। তবে চিকিৎসকেরা আপত্তি জানালে হাতকড়া খুলে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। হাতকড়া ব্যবহারের নির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন।”
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বলা হয়েছিল, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের হাতকড়া পরানোর ক্ষেত্রে আইনের অপব্যবহার করা যাবে না এবং বেঙ্গল পুলিশ রেগুলেশন (পিআরবি) বিধি ৩৩০ মেনে চলা বাধ্যতামূলক। এর আগেও সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনসহ একাধিক রাজনৈতিক নেতাকে হাসপাতালে হাতকড়া পরিয়ে রাখার ছবি ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। আইসিইউর মতো স্পর্শকাতর স্থানে চিকিৎসাধীন আসামিদের ক্ষেত্রে দ্রুত সুনির্দিষ্ট ও মানবিক নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা।
