নিজস্ব প্রতিবেদন : কানাডাজুড়ে জ্বলতে থাকা শতাধিক দাবানলের ধোঁয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ঢেকে গেছে। নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, মিনেসোটা, উইসকনসিন, মিশিগানসহ একাধিক অঙ্গরাজ্যে বায়ুর মান মারাত্মকভাবে অবনতি হওয়ায় স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, দাবানলের ধোঁয়া এবং তীব্র গরম একসঙ্গে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সিটিসহ আশপাশের এলাকায় ‘কোড রেড এয়ার কোয়ালিটি অ্যালার্ট’ জারি করা হয়। কানাডার অন্টারিও প্রদেশ থেকে ভেসে আসা ঘন ধোঁয়ায় শহরের আকাশ হলুদ ও কমলা রঙের কুয়াশায় ঢেকে যায়। বায়ুতে ক্ষতিকর সূক্ষ্ম কণার মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে খারাপ ধোঁয়ার দিন।” তিনি নিউইয়র্কবাসীকে যতটা সম্ভব ঘরের ভেতরে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। মেয়র আরও বলেন, এই দূষণ শুধু শিশু, বয়স্ক বা আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য নয়, প্রত্যেক নিউইয়র্কবাসীর জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। “আজ এমন দিন নয় যে বায়ুর মান উপেক্ষা করে স্বাভাবিক কাজকর্ম করবেন। যদি আজ বাইরে দৌড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করে থাকেন, সেটি আগামীকালের জন্য রেখে দিন।” তিনি জানান, নিউইয়র্ক সিটির পাঁচটি বরোতেই শত শত স্থানে বিনামূল্যে কেএন৯৫ মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে।
এদিকে মিনেসোটার দুর্গম বাউন্ডারি ওয়াটার্স ক্যানো এরিয়া উইল্ডারনেস থেকে হাজার হাজার পর্যটক ও ক্যাম্পারকে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বজ্রপাতের কারণে এক সপ্তাহেরও বেশি আগে শুরু হওয়া অন্তত ১৭টি দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পুরো এলাকাটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের ধারণা, উদ্ধার অভিযান শুরুর সময় ওই এলাকায় ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার মানুষ অবস্থান করছিলেন। অনেককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকায় চলতে হয়েছে, আবার অনেককে নৌকা কাঁধে নিয়ে স্থলপথ অতিক্রম করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
উদ্ধার হওয়া অনেক ক্যাম্পার জানিয়েছেন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় এবং চারপাশে আগুনের তাপ স্পষ্টভাবে অনুভূত হতে থাকে। কেউ কেউ বলেন, চারদিক আগুনে ঘেরা অবস্থায় বন বিভাগের উদ্ধারকারী নৌকা এসে তাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। কানাডার অন্টারিওতেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। একটি ট্রেনের কর্মীরা চারদিকের আগুনে আটকা পড়লেও পরে নিরাপদে উদ্ধার হন। বর্তমানে কানাডাজুড়ে ১০০টিরও বেশি দাবানল জ্বলছে এবং বাতাসের প্রবাহে সেই ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাবানলের ধোঁয়ায় থাকা সূক্ষ্ম কণা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্ট, কাশি, মাথা ঘোরা, চোখে জ্বালা, ক্লান্তি এবং হৃদ্রোগ বা ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। শিশু, বয়স্ক এবং হাঁপানি রোগীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। মিনেসোটার অনেক এলাকায় আকাশ কমলা রঙ ধারণ করেছে, যা অনেকেই “মঙ্গল গ্রহের আকাশের” সঙ্গে তুলনা করেছেন। ডুলুথ শহরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে পুরো এলাকায় ক্যাম্পফায়ারের মতো গন্ধ পান। অনেকের চোখ জ্বালা করতে শুরু করে এবং হাঁপানির রোগীদের ইনহেলার ব্যবহার করতে হয়েছে। কোথাও কোথাও কয়েকশ ফুট দূরের দৃশ্যও দেখা যাচ্ছিল না।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫টি অঙ্গরাজ্যে প্রায় ৪০টিরও বেশি বড় দাবানল জ্বলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দাবানলের তীব্রতা ও বিস্তার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় বাইরে না যাওয়া, কেএন ৯৫ বা এন ৯৫ মাস্ক ব্যবহার, জানালা-দরজা বন্ধ রাখা এবং এয়ার পিউরিফায়ার বা এয়ার কন্ডিশনার চালিয়ে ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দিয়েছে। আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে দাবানলের ধোঁয়ার প্রভাব আগামী কয়েক দিন, এমনকি কিছু এলাকায় আরও দীর্ঘ সময় স্থায়ী হতে পারে।
