নিজস্ব প্রতিবেদন : ঝিনাইদহ জেলা শহরের প্রবেশদ্বারে নির্মিত দেশের অন্যতম গৌরব বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর ও ভাস্কর্যটি গত কয়েক দিন ধরে ভাঙা হচ্ছে। তবে কে বা কারা ঠিক কী কারণে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি ভেঙে ফেলছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছুই বলতে পারছেন না প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কেউ। জেলা শহরের প্রবেশমুখের এই গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্যটি রাতারাতি এভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
Wednesday বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, একদল শ্রমিক চত্বরটি ভাঙার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে কার নির্দেশে বা কোনো সরকারি প্রকল্পের আওতায় এই কাজ চলছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিকরা কোনো স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। ভাস্কর্য ভাঙার বিষয়ে ঝিনাইদহ পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ আলী খানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “কেন এটি ভাঙা হচ্ছে তা আমার জানা নেই। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ভালো বলতে পারবেন।”
তবে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন জেলা প্রশাসনের এই ভাঙচুরের সাথে কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন। তিনি বলেন, “জেলা প্রশাসন এই স্থাপনা ভাঙার কাজ করছে না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই ভাস্কর্যটি ওই জায়গা থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সম্ভবত সড়ক বিভাগ ও পৌরসভা সেই পুরনো সিদ্ধান্তই এখন বাস্তবায়ন করছে। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে জেলা police লাইনসের সামনে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি নতুন প্রতিকৃতি করার পরিকল্পনা রয়েছে।” একই সাথে এই অপসারণের বিষয়ে জানতে তিনি সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তবে জেলা প্রশাসকের এমন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ঝিনাইদহ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান উল্টো দাবি করে বলেন, “কারা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে এই ভাস্কর্য ও চত্বরটি অপসারণ করছে, তা আসলে আমার জানা নেই।”
স্থাপনাটি ভাঙার দায় বা তথ্য কোনো পক্ষই সরাসরি স্বীকার না করায় বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা আরও ঘনীভূত হয়েছে। এই বিষয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক এম মাজিদ জানান, সেখানে যে ভাস্কর্যটি ছিল, তার নকশা দিয়ে আসলে কী বোঝাতে চেয়েছিল তা নির্ধারণ করা কঠিন ছিল। তদুপরি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষার্থীরা দুই দফায় এটি ভাঙচুরও করেছিল। এছাড়া এলাকাটিতে এই চত্বরটি প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বেশ কয়েকটি সমন্বয় সভায় এটি সরানোর সিদ্ধান্ত হলেও এটি ভাঙার চূড়ান্ত দায়িত্ব নিতে কোনো সংস্থা রাজি ছিল না। ফলে এখন ঠিক কারা এই ভাঙার কাজটি করছে, তা তাঁরও জানা নেই। অন্যদিকে জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ জানান, ঝিনাইদহ শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের কাছের গোলচত্বরে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি পূর্ণাঙ্গ ও দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
২০১৯ সালে ঝিনাইদহ পৌরসভা শহরের প্রবেশদ্বারে ৩০ ফুট উচ্চতা ও ১০ ফুট প্রস্থের এই বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে দীর্ঘদিনের অবহেলা ও তদারকির অভাবে ভাস্কর্যটি কখনো তার নির্ধারিত রূপ পায়নি, উল্টো একপর্যায়ে পুরো চত্বরটি আগাছায় ঢেকে যায়। এই বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দেশের প্রতিটি জেলা শহরের প্রবেশমুখে বিশিষ্ট ব্যক্তি বা ঐতিহ্য তুলে ধরে কোনো না কোনো ভাস্কর্য থাকে। এই চত্বরটি ছিল ঝিনাইদহের গর্ব বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে। এখন দেখছি এটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে, কিন্তু কেন ভাঙা হচ্ছে তা আমরা সাধারণ মানুষ জানি না।” অন্যদিকে ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য আলী আজম মো. আবু বকর জানান, সংসদ আদেশ চলছে এবং তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন বিধায় বিষয়টি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না।
জেলা শহরের প্রবেশমুখ থেকে এভাবে বীরশ্রেষ্ঠের নামলিপি ও ভাস্কর্য মুছে ফেলার ঘটনায় ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা। বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “জীবন উৎসর্গ করে তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছেন। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান শুধু ঝিনাইদহ নয়, পুরো দেশের গর্ব। তাঁর নামে একটি চত্বর থাকলে নতুন প্রজন্ম তাঁর অবদান সম্পর্কে জানতে পারবে। এটি জেলার প্রবেশমুখে হলে আগত দর্শনার্থীরাও তাঁর গৌরব সম্পর্কে জানতে পারতেন।” ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজারের ধলাই সীমান্তঘাঁটি দখলের লড়াইয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হওয়া ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহী হামিদুর রহমানের স্মৃতির প্রতি এমন উদাসীনতায় ঝিনাইদহজুড়ে তীব্র সমালোচনা চলছে।
