৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশের শিল্প খাতে ঘটে যাওয়া একের পর এক সহিংসতা ও রূপগঞ্জের ‘গাজী টায়ার ট্র্যাজেডি’ বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে এক বড় নেতিবাচক বার্তা পাঠিয়েছে। কারখানা কোনো রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শ অনুসরণ করে না; অথচ কেবল মালিকের ওপর আক্রোশ মেটাতে গিয়ে ক্ষোভের আগুনে দেশের জাতীয় সম্পদ ও হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান পুড়িয়ে ফেলার এই আত্মঘাতী প্রবণতা দেশের অর্থনীতিতে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করছে।
সম্প্রতি বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ডের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী) এক কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠান এখন আর বিদেশি নয়, বরং দেশীয় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বেশি জোর দিচ্ছে। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্টের প্রবাহ দুর্বল হওয়ার অজুহাতে তিনি এই অবস্থান ব্যক্ত করেন। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাঁর নিয়োগের সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বাংলাদেশে বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসার যে জোরদার আশার ফুলঝুরি ছড়ানো হয়েছিল, বাস্তবতার মাঠে তা এখন ‘আশায় গুড়েবালি’তে পরিণত হয়েছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও কাজের ধারাবাহিকতার স্বার্থে তাঁকে বহাল রাখা হলেও তাঁর এই সাম্প্রতিক বক্তব্য দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অকার্যকারিতাই এখন বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামীপন্থি শিল্পপতিদের কলকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের যে চিত্র বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মারাত্মকভাবে আতঙ্কিত করেছে। গত ২২ জুন জাপানের একটি শীর্ষ থিঙ্কট্যাঙ্কে কর্মরত এক কর্মকর্তার সূত্রে জানা যায়, রূপগঞ্জের গাজী টায়ার কারখানায় দল বেঁধে যেভাবে লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তা দেখে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন। এখনও জাপানি বিনিয়োগ মহলে বাংলাদেশের অস্থিতিশীল পরিবেশ বোঝাতে ‘গাজী টায়ার ট্র্যাজেডি’র উদাহরণ দেওয়া হচ্ছে।
৫ আগস্টের পর সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর মালিকানাধীন গাজী টায়ার কারখানায় নারায়ণগঞ্জসহ কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদী থেকে আসা হাজার হাজার মানুষ লুটপাটে মেতে ওঠে। একপর্যায়ে লুটের মাল নিয়ে নিজেদের মধ্যকার মারামারির জেরে কারখানায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কেমিক্যালের কারণে মুহূর্তেই পুরো কারখানা নরকে পরিণত হয় এবং ভেতরে আটকা পড়ে অনেক মানুষ জীবন্ত পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আগুন নেভার পরও দুই মাস ধরে অরক্ষিত কারখানার বাকি অংশে নিয়মিত লুটপাট চলেছে।
তবে এই ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্যে ভিন্ন এক সামাজিক ক্ষোভের কাহিনিও রয়েছে। গোলাম দস্তগীর গাজী ক্ষমতার দাপটে রূপগঞ্জের বহু সাধারণ মানুষের জমি নামমাত্র মূল্যে দিতে বাধ্য করেছিলেন। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের পাশাপাশি দেশের এক শীর্ষস্থানীয় ভূমিদস্যু গ্রুপের সঙ্গে তাঁর ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরে সরকার পতনের পর ওই কোম্পানির লোকেরাও এই লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে অংশ নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গাজী সাহেব অন্যায়ভাবে জমি নিয়ে থাকলে তা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়, তবে তাঁর গড়ে তোলা এই প্রতিষ্ঠানটি হাজার হাজার মানুষের জীবিকার সংস্থান করেছিল। আজ কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গরিবের বাহন রিকশা, সাইকেল ও মোটরবাইকের টায়ারের দাম এক লাফে ২০% বেড়ে গেছে এবং চীন ও ভারত থেকে তা আমদানি করতে হচ্ছে।
গাজী টায়ার ট্র্যাজেডি থেকে বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতার দাপট দিয়ে কোনো মহৎ কাজ করলেও তা কখনো টেকসই হয় না। রাজনীতি যদি ক্ষমতার উৎস হয় এবং তা দিয়ে জনগণকে ক্ষুব্ধ করা হয়, তবে সংকটের দিনে সেই জনগণ প্রতিষ্ঠান রক্ষা করে না। তবে একই সাথে মালিককে শায়েনস্তা করার নামে জাতীয় সম্পদ ধ্বংসের এই আত্মঘাতী সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে যে, ক্ষমতার রদবদল হলেও কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস করা যাবে না। অন্যথায় দেশি-বিদেশি পুঁজি হারানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে এবং অর্থ পাচারের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে।
