নিজস্ব প্রতিনিধি : রাজধানীর আরামবাগ, শাহবাগ, তেজগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পেট্রোল পাম্পের সামনে এখন মানুষের নাভিশ্বাস দশা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি ১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি পাচ্ছেন না। রাইড শেয়ারিং চালকদের আয় বন্ধের উপক্রম হয়েছে, সাধারণ কর্মজীবী মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে রাজপথে। পাম্পগুলোতে তেলের সিরিয়াল দেওয়া নিয়ে কোথাও কোথাও হাতাহাতির মতো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে। অথচ মাঠের এই ভয়াবহ চিত্রের বিপরীতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দাবি করছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে বর্তমানে জ্বালানির সর্বোচ্চ মজুত রয়েছে।
সরকারের এই দাবি আর বাস্তবতার মধ্যকার আকাশ-পাতাল বৈপরীত্য জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে এ ধরনের ঘোষণা আর বাস্তবতার ফারাক হওয়া একটি নিয়মিত ঘটনা। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সেই দুঃসহ স্মৃতি আবারও জনমনে ফিরে আসছে, যখন লোডশেডিং, জ্বালানি সংকট আর সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে বাজার জিম্মি হয়ে পড়েছিল। সেই পুরনো সংকটের চেহারাটাই ২০২৬ সালে এসে নতুন করে ফিরে এসেছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
পাম্প কর্তৃপক্ষগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট। তারা জানাচ্ছেন, যেখানে তিন গাড়ি তেলের চাহিদা রয়েছে, সেখানে ডিপো থেকে বরাদ্দ মিলছে মাত্র এক গাড়ি। এই বিপুল ঘাটতির কারণে সার্বক্ষণিক তেল সরবরাহ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। অথচ সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে পর্যাপ্ত মজুতের গালভরা গল্প শোনানো হলেও বিতরণ ব্যবস্থার এই সংকট নিরসনে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। তেলের সুষ্ঠু বণ্টনের নামে ‘ফুয়েল পাস’ চালুর কথা বলা হলেও তা এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি, যাকে অনেকেই জনগণের সঙ্গে নতুন ভাঁওতা হিসেবে দেখছেন।
উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন হয়েছে, যেখানে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নেয়নি এবং জনগণের একটি বড় অংশ ভোট বর্জন করেছে। সেনানিবাসে জন্ম নেওয়া এবং দুর্নীতি-সন্ত্রাসের অভিযোগে বিদ্ধ একটি দল ক্ষমতা দখল করার পর দেশ পরিচালনার নমুনা এখন পাম্পের সামনে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ লাইনেই ফুটে উঠছে। জবাবদিহিহীন একটি শাসনব্যবস্থায় জনদুর্ভোগ চরম সীমায় পৌঁছেছে।
জ্বালানি সংকটের এই নেতিবাচক প্রভাব কেবল যানবাহনের ওপরই সীমাবদ্ধ থাকছে না। কৃষিতে সেচ কাজ ব্যাহত হওয়া, পণ্য পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় ধস নামার মতো বহুমুখী সংকট তৈরি হয়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অথচ এই কঠিন সময়েও সরকারের প্রতিমন্ত্রী ‘সর্বোচ্চ মজুত’-এর ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মজুত থাকার পরও কেন পাম্পে তেল নেই—এই যৌক্তিক প্রশ্নের উত্তর সরকারের কোনো দফতর থেকে মিলছে না। বিতরণ ব্যবস্থার গলদ, সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কারা ফায়দা লুটছে, সে বিষয়ে কোনো স্বচ্ছ তথ্য দিচ্ছে না সরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, যে সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নয়, তাদের কাছ থেকে এই সংকটের সমাধান আশা করা এখন কেবলই বোকামি।
