২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ড. ইউনূসের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক নজিরবিহীন আর্থিক সুবিধা পেতে শুরু করে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গ্রামীণ ব্যাংককে আয়কর অব্যাহতি, গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকা মাফ এবং গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশনের শর্তহীন ভ্যাট সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
করমুক্ত গ্রামীণ ব্যাংক ৫ বছরে ১০০০ কোটি টাকার ক্ষতি: ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর এক সরকারি গেজেটের মাধ্যমে ২০২৯ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের সব ধরনের আয়কে করমুক্ত ঘোষণা করা হয়।
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আয়কর জমা দিত। আগামী ৫ বছর এই সুবিধা বহাল থাকায় সরকার অন্তত ১০০০ কোটি টাকার নিশ্চিত রাজস্ব হারাবে।
যেখানে আইএমএফ কর অব্যাহতি কমানোর শর্তে ঋণ দিচ্ছে, সেখানে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘অস্বচ্ছ’ ও ‘বিতর্কিত’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। মজার ব্যাপার হলো, নিজের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার পর ২০২৫ সালে নতুন আইন করা হয় যে, এখন থেকে কর অব্যাহতি দিতে হলে সংসদের অনুমতি লাগবে।
গ্রামীণ কল্যাণ ট্রাস্ট তাদের দেওয়া ঋণের সুদকে ‘লভ্যাংশ’ হিসেবে দেখিয়ে বছরের পর বছর কম কর দিয়ে আসছিল। এনবিআর-এর পাওনা ৬৬৬ কোটি টাকার বিপরীতে গ্রামীণ কল্যাণ আপিল ও ট্রাইব্যুনালে হেরে গিয়েছিল। এমনকি ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট তাদের রিট খারিজ করে টাকা পরিশোধের আদেশ দেন। কিন্তু ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার শপথ নেওয়ার পরপরই ৩ অক্টোবর আদালত স্বতঃপ্রণোদিতভাবে আগের রায় প্রত্যাহার করে নেন, যার ফলে এই ৬৬৬ কোটি টাকা আর সরকারকে দিতে হচ্ছে না।
গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি আড়াই শতাংশ ভ্যাট সুবিধা পাওয়ার জন্য দেশে ৫০ শতাংশ ব্যাটারি ও চার্জার উৎপাদনের শর্ত দিয়েছিল। তবে এনবিআর ও বুয়েটের যৌথ তদন্তে দেখা গেছে, তাদের ব্যাটারি তৈরির কোনো মেশিনই নেই এবং তারা সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। শর্ত লঙ্ঘন করলেও এনবিআর তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, যার ফলে সরকারের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০১১-১২ করবর্ষ থেকে গ্রামীণ কল্যাণ ট্রাস্টের বিরুদ্ধে ১,০৪৩ কোটি টাকা কর ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। এনবিআর-এর ডিমান্ড নোটের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটি হাইকোর্টে রিট করে মামলাটি ঝুলিয়ে রেখেছে। আপিল ও ট্রাইব্যুনালে গ্রামীণ কল্যাণের বিপক্ষে রায় গেলেও এখন পর্যন্ত এই বিশাল অংকের পাওনা আদায় করা সম্ভব হয়নি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মতে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসে নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য এমন আর্থিক সুবিধা নেওয়া সরাসরি ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest) এবং শপথের লঙ্ঘন। এটি কেবল সাধারণ ব্যবসায়ীদের অসম প্রতিযোগিতায় ফেলছে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
