শামীম আহমেদ
আজকে আমার এমবিএ ক্লাসে ম্যানেজমেন্ট অফ পপুলেশন হেলথ কোর্সে হল্যান্ডের এক এক্সচেঞ্জ ছাত্রীর সাথে কথা হচ্ছিল। সে বলল নেদারল্যান্ডস ও বেশীরভাগ ইউরোপিয়ান দেশে ক্লাসে পাশ করলেই সবাই মহা খুশী হয়। বাচ্চারা শিখতে শিখতে আর আনন্দ করতে করতে বড় হয়। ও বলল, ক্যানাডায় সবাই খুব স্ট্রেসড। ৮০% না পেলে মারা যায় যায় অবস্থা।
আমরা একটা ডকুমেন্টারি নিয়ে আলোচনা করছিলাম। সেখানে ইউনিসেফ বলেছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী ডাচ শিশুরা এবং এর মূল কারণ তাদের শিক্ষাব্যবস্থা আনন্দের। সেখানে জ্ঞানার্জনকে প্রাধান্য দেয়া হয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নয়। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত G8 এবং OECD দেশগুলোর কোনগুলোতে স্কুলে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দিতে হয় আমার জানা নেই।
ইউরোপে বাবা-মা’রা বাচ্চাকে নিয়ে টিউটরদের বাসায় বাসায় দৌড়ায় না। স্কুলের ফুটপাতে পরীক্ষার দিন সুরা ইয়াসিন পড়তে পড়তে ধড়ফড় করে না। বরঞ্চ বাচ্চাকে নিয়ে বিচে যায়, পার্কে যায়, মুভি দেখে, গল্প করে।
ক্যানাডায় যার বাসা যেখানে তাকে সেই এলাকার স্কুলে পড়তে হয়। আমরা যখন ছোট ছিলাম, যখনও আমাদের আব্বারা সরকারি চাকরি করেও সৎ থাকতেন, তখন সারা দেশে ঘুরে ঘুরে আমাদের পড়তে হতো। তাই জেলা স্কুলগুলো সেরা ছিল।
ঘুষ খাওয়া সরকারি কর্মকর্তারা যখন ঢাকার বাইরে পোস্টিং নিয়ে ৫০ হাজার টাকার বেতনে পরিবারকে গুলশানে বাড়ি ভাড়া করে বাচ্চাকে স্কলাসটিকায় পড়ানো শুরু করল তখন থেকে শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংস শুরু।
আমি University of Toronto তে Issues in Child Health & Cognitive Development পড়াই। কোনো যুক্তিতেই শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অজুহাতে মানসিক অসুস্থতার কারখানা বানানোর কারণ নেই। ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াও সুস্থ বিনোদনমূলক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার অনেক উপায় আছে সৃজনশীল উপায়ে। শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করেন যারা তাদের পরামর্শ চাইলে তারা পথ বাতলে দিতে পারেন।
এসব বলে কোন লাভ নেই। সমাজ সন্তানকে ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া আর কিছু বানাতে চায় না। এই অসম্ভব প্রতিযোগীতা করা বাচ্চাগুলো বড় হয় মানসিক অসুস্থতা নিয়ে। তারপর এত যন্ত্রণা ভোগ করে সেরা স্কুল কলেজে পড়ে দেশকে জলে ভাসিয়ে এদের সেরা ১% চলে যায় আমেরিকা, ক্যানাডা আর ইংল্যান্ডের সেবা করতে। বাকিরা বিকৃত মানসিকতা নিয়ে দেশে থেকে কোটাবিরোধী আন্দোলন করে পুলিশ, কুকুর, বেড়াল পুড়িয়ে, পিটিয়ে মারে।
এত এত অবাস্তব, অসুস্থ প্রতিযোগীতাপ্রেমী দেশ জন্ম দেয় স্যুডো বিপ্লবী, বিকৃত মানসিকতার লক্ষ লক্ষ অকর্মক্ষম বিপজ্জনক কিছু আত্মঘাতী মানুষ, যারা পরে পরিণত হয় অসুখী আগ্রাসী অভিভাবকে। যারা নিজেদের মতোই অসুস্থ, অসুখী শিশু বড় করতে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
যদিও লাভ নেই বলে, তবুও বলি আমাদের শিশুদের এইসব অসুস্থ প্রতিযোগীতা থেকে মুক্তি দিন। তাদের মানবিক ও সুখী মানুষ হিসেবে বড় হতে দিন।
