দেশের ব্যাংক খাতে এই মুহূর্তে যা চলছে, তা কেবলমাত্র সংখ্যাজনিত কোনো সমস্যা না। এটা দেশের কোটি মানুষের জমানো টাকার নিরাপত্তার প্রশ্ন। আর এই সংকটের শিকড় খুঁজতে গেলে বারবার ফিরে আসতে হয় ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাড়ে সতেরো মাসে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯১ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। মানে, ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার কথা ছিল, তার প্রায় অর্ধেকই রাখতে পারেনি। চার লাখ ৪১ হাজার কোটির বিপরীতে রাখা গেছে মাত্র দুই লাখ ৪৯ হাজার কোটি। বাকিটা শূন্য। এই শূন্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের না পাওয়া ঋণ, উদ্যোক্তার বন্ধ হয়ে যাওয়া স্বপ্ন, আর একটা গোটা অর্থনীতির টলমল করা ভিত।
খেলাপি ঋণ একটা দেশের ব্যাংকিং সিস্টেমের জ্বর মাপার থার্মোমিটার। সেই থার্মোমিটার যদি বলে বিতরণ করা মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশ এখন খেলাপি, তাহলে বুঝতে হবে রোগীর অবস্থা সংকটজনক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে দুই লাখ ১১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। একটা বছরে এই পরিমাণ বৃদ্ধি স্বাভাবিক কোনো অর্থনৈতিক চাপের ফল না। এটা ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ ব্যর্থতার প্রমাণ।
ইউনুস সরকার ক্ষমতায় এসেছিল সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু ব্যাংক খাতে তাদের সংস্কার মানে দাঁড়াল নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ পুনর্বিন্যাস করা আর দুর্বল ব্যাংকগুলোকে আরো দুর্বল হতে দেওয়া। যে ব্যাংকগুলো আগে থেকেই অসুস্থ ছিল, তাদের চিকিৎসার বদলে দিনের পর দিন ফেলে রাখা হলো। অথচ একজন দায়িত্বশীল শাসকের প্রথম কাজ হওয়ার কথা ছিল আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করা।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ৭০ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে আরো বেশি, এক লাখ ২১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। এই সংখ্যাগুলো দেখলে বোঝা যায় সমস্যা কতটা গভীরে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঘাটতি মানে সরকারি কোষাগারের ওপর চাপ, অর্থাৎ করদাতাদের টাকায় সেই ক্ষতি পোষাতে হবে। আর বেসরকারি ব্যাংকের ঘাটতি মানে আমানতকারীদের টাকার ঝুঁকি।
মুহাম্মদ ইউনুস নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। ক্ষুদ্রঋণের মডেল নিয়ে তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতি আছে। কিন্তু দেশ চালানো আর বক্তৃতা দেওয়া এক জিনিস না। একটা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন বলছে ব্যাংকগুলো গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না, ঋণ দিতে পারছে না, আর দেওয়া ঋণ আদায় করতে পারছে না, তখন নেতৃত্বে যে মানুষটি আছেন তাঁকে সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আনতে হয়। কিন্তু সেই জবাবদিহি হয়নি। বরং প্রতিটি ব্যর্থতার পর নতুন কমিটি, নতুন বিবৃতি, আর পুরনো অজুহাত।
একটা কথা বলে রাখা দরকার। বিদেশি ব্যাংকগুলো এই পরিস্থিতিতেও ৩৩৮ কোটি টাকার প্রভিশন উদ্বৃত্ত রেখেছে। মানে, দেশের মাটিতে কাজ করা বিদেশি প্রতিষ্ঠান ঠিকঠাক নিয়ম মানতে পারছে, আর দেশীয় ব্যাংকগুলো পারছে না। এটা ব্যবস্থাপনার সমস্যা, নীতির সমস্যা, আর সদিচ্ছার সমস্যা।
অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি ঠিকই বলেছেন, প্রভিশন ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে মূলধন পর্যাপ্ততার ওপর আঘাত করে। মূলধন কমলে নতুন ঋণ আটকে যায়, বিনিয়োগ থমকে যায়, কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। এই শৃঙ্খলটা ভাঙা সহজ না। বছরের পর বছর লাগে। আর সেই সময়ের মাশুল দেয় সাধারণ মানুষ, যার ব্যাংকে কিছু সঞ্চয় আছে, যে ছোট ব্যবসার জন্য ঋণ চাইছে, যে চাকরি খুঁজছে।
ইউনুস সরকার এখন আর নেই। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু যে ক্ষতটা রেখে গেছে সেই সরকার, সেটা রাতারাতি সারানোর না। এক লাখ ৯১ হাজার কোটির প্রভিশন ঘাটতি, দুই লাখ ১১ হাজার কোটির বাড়তি খেলাপি ঋণ, এগুলো শুধু সংখ্যা না। এগুলো হলো একটা সরকারের ব্যর্থতার দলিল, যে সরকার দেশ সংস্কারের কথা বলতে বলতে দেশের আর্থিক মেরুদণ্ডকে আরো বাঁকিয়ে দিয়ে গেছে।