বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আবির্ভূত হওয়া কিছু রাজনৈতিক শক্তি প্রায়ই নিজেদেরকে জাতীয়তাবাদের একমাত্র ধারক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। তারা বক্তৃতার মঞ্চে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা ছাত্রসমাবেশে এমন সব আগুনঝরা বক্তব্য দেয়, যেন দেশপ্রেমের একমাত্র লাইসেন্স তাদের হাতেই। কিন্তু বাস্তবতা যখন সামনে আসে, তখন সেই আগুনঝরা ভাষণ অনেক সময়ই গলে গিয়ে কূটনৈতিক সৌজন্যের মিষ্টি হাসিতে রূপ নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ইফতার মাহফিলের দৃশ্য যেন সেই দ্বিচারিতারই আরেকটি উদাহরণ।
যে দলটি কিছুদিন আগেও জনসভায় “দিল্লি না ঢাকা” স্লোগান তুলে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল, যে নেতারা ভারতের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দিয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন—সেই একই নেতাদের এবার ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে হাসিমুখে আলাপচারিতায় মেতে উঠতে দেখা গেল। শুধু ভারতই নয়, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, খোশগল্প এবং রাজনৈতিক আলাপচারিতার মাধ্যমে তারা যেন হঠাৎ করেই কূটনৈতিক বাস্তবতার গুরুত্ব উপলব্ধি করলেন।
প্রশ্ন উঠছে—তাহলে কি সেই আগের সব বক্তব্য ছিল শুধুই রাজনৈতিক নাটক? জনতার আবেগকে উসকে দিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার কৌশল?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই দ্বিমুখী আচরণ নতুন কিছু নয়। ইতিহাস সাক্ষী, অনেক দলই ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে একদিকে তীব্র জাতীয়তাবাদী ভাষা ব্যবহার করে, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে একই শক্তির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে। কিন্তু এনসিপির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ তাদের রাজনৈতিক উত্থানের বড় একটি অংশই দাঁড়িয়ে ছিল ভারতের বিরুদ্ধে তীব্র বক্তব্য এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রভাবের বিরুদ্ধে কথিত প্রতিরোধের উপর।
কিছুদিন আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনসিপি ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের মুখে শোনা যেত—বাংলাদেশের রাজনীতি নাকি দিল্লির ইশারায় চলছে। কেউ কেউ তো আরও এক ধাপ এগিয়ে ভারতের “সেভেন সিস্টার্স” অঞ্চল নিয়ে কৌতুকপূর্ণ কিংবা উসকানিমূলক মন্তব্য করতেও দ্বিধা করেনি। সেই একই রাজনৈতিক শক্তিকে এখন যখন ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে সৌজন্য হাসিতে মেতে উঠতে দেখা যায়, তখন সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—কোনটা আসল? বক্তৃতার আগুন, নাকি ইফতার টেবিলের কূটনৈতিক সৌজন্য?
গুলশানের ওই ইফতার মাহফিলে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। সেখানে এনসিপির নেতারা কূটনীতিকদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন, আলাপচারিতায় অংশ নেন এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক আচরণ হলেও, আগের বক্তব্যের সঙ্গে এর সাংঘর্ষিক অবস্থানই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রের বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে সুকৌশলে দলীয়করণ করা হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত। তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুত একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা প্রয়োজন।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সমালোচকদের মতে তার দলের পূর্বের বক্তব্য এবং বর্তমান কূটনৈতিক আচরণের মধ্যে বড় ধরনের বৈপরীত্য রয়েছে। কারণ যে দলটি কিছুদিন আগেও বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে তীব্র বক্তব্য দিয়েছে, সেই দলই এখন বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী।
অবশ্য আন্তর্জাতিক কূটনীতি এমনই এক বাস্তবতা, যেখানে চরম বিরোধিতার ভাষাও অনেক সময় কূটনৈতিক টেবিলে এসে নরম হয়ে যায়। বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্রগুলোও প্রকাশ্যে একে অপরকে সমালোচনা করলেও পর্দার আড়ালে আলোচনায় বসে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সমস্যা হয় তখনই, যখন জনতার সামনে এক ধরনের বক্তব্য দেওয়া হয় এবং বাস্তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন আচরণ করা হয়।
এই দ্বিমুখী রাজনীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় জনমতের উপর। কারণ সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে—রাজনৈতিক বক্তব্যের অনেকটাই আসলে কৌশলগত নাটক। এতে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়।
বাংলাদেশের রাজনীতি এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে বিভাজন, উত্তেজনা এবং পারস্পরিক দোষারোপের মধ্য দিয়ে চলছে। নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তি যখন আবির্ভূত হয়, তখন মানুষ আশা করে তারা হয়তো নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করবে। কিন্তু যদি সেই নতুন শক্তিও পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল—অর্থাৎ বক্তৃতায় এক কথা, বাস্তবে আরেক আচরণ—অনুসরণ করে, তাহলে পরিবর্তনের আশা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়।
এনসিপির এই ইফতার মাহফিলের দৃশ্য তাই শুধু একটি সামাজিক বা কূটনৈতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। যেখানে জনসভায় উচ্চারিত স্লোগান আর কূটনৈতিক টেবিলের বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য দেখা যায়।
প্রশ্নটি তাই এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—
রাজনীতি কি শুধুই স্লোগানের খেলা?
নাকি বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে সৎ ও ধারাবাহিক অবস্থান নেওয়ার সময় এসেছে?
বাংলাদেশের মানুষ আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা এখন শুধু বক্তৃতা শুনে সিদ্ধান্ত নেয় না; তারা আচরণও দেখে। স্লোগান আর বাস্তবতার ফারাক যত বড় হবে, জনতার প্রশ্নও তত তীব্র হবে।
এনসিপির জন্যও এটাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—
তারা কি সত্যিই নীতির রাজনীতি করবে,
নাকি স্লোগান আর কূটনীতির মাঝখানে দোদুল্যমান এক নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরি করবে?
