লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রাণবন্ত শহর কোরোনা, ক্যালিফোর্নিয়া। এই শহরের একটি ব্যস্ত এলাকায় রয়েছে ‘KPC Parkway‘, যার নামকরণ করা হয়েছে দূরদর্শী উদ্যোক্তা কালী প্রদীপ চৌধুরীর নামে। তিনি KPC Group -এর প্রতিষ্ঠাতা, বহুজাতিক যে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পখাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।

কালী প্রদীপ চৌধুরীর শিকড় বাংলাদেশের সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ গ্রামে। তিনি একটি ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা কালীপ্রসন্ন দত্ত চৌধুরী ব্রিটিশ আমলে অত্র এলাকার জমিদার ছিলেন। যদিও ‘ঢাকা’ নামটি শুনলে অনেকেরই রাজধানী শহরের কথা মনে হতে পারে, কিন্তু তাঁর পূর্বপুরুষদের গ্রাম ঢাকাদক্ষিণ একটি আলাদা ঐতিহাসিক জনপদ।
পেশাগতভাবে কালী প্রদীপ চৌধুরী একজন প্রশিক্ষিত অর্থোপেডিক সার্জন। তবে, চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে। ১৯৬০–এর দশকের শেষ দিকে পরিবারের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি মাত্র আট ডলার পকেটে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। আমেরিকায় তাঁর সাফল্যের গল্প যেন রূপকথাকেও হার মানায়! যা তাঁর দৃঢ়তা ও অধ্যবসায়ের উজ্জ্বল উদাহরণ।

শুরুতে তিনি চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই একজন দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে অনেক প্রভাবশালী রোগী তাঁর চিকিৎসা নিতে আসতেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে এই সাফল্যই তাঁর পরবর্তী ব্যবসায়িক উদ্যোগের ভিত্তি গড়ে দেয়। তিনি একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যা তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের সূচনা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে KPC Group -এর সম্পদের পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার সমান। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মোট আটটি দেশে তাদের কার্যক্রম রয়েছে এবং ২৫টিরও বেশি ব্যবসা খাতে তারা কাজ করছে।
ব্যবসার পাশাপাশি সমাজেও তাঁর প্রভাব সুস্পষ্ট। কোরোনা শহরে তাঁর মায়ের স্মরণে একটি সড়কের নাম রাখা হয়েছে – ‘Shobha Way’। যদিও পরিবারের প্রকৃত উপাধি ‘দত্ত’, তবুও ‘চৌধুরী’ পদবিই আজ তাঁদের পরিচয় ও ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
KPC Group -এর ব্যবসার পরিধি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এর রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, বিলাসবহুল পাঁচতারকা হোটেল, বাণিজ্যিক স্থাপনা, মেডিকেল কলেজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ওয়াইনারি (Winery) এবং চা বাগান। শুধু ভারতেই তাঁর তত্ত্বাবধানে রয়েছে ১৬টি চা বাগান। পাশাপাশি তিনি জ্বালানি খাতেও বিনিয়োগ করেছেন; ইউক্রেনে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং দুবাইয়ে একটি সাততারকা হোটেল প্রকল্পের সঙ্গেও তিনি যুক্ত।

ক্যালিফোর্নিয়াতেও তাঁর বেশ কিছু বড় উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাজ্যে Buckingham Palace -এর বিপরীতে একটি পরিবেশবান্ধব ‘গ্রীন টাউন’ নির্মাণের কাজও তিনি করছেন বলে জানা যায়।

স্বাস্থ্যসেবার প্রতি তাঁর আগ্রহ এখনো অটুট। সম্প্রতি তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসের দুটি হাসপাতাল অধিগ্রহণ করেছেন, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যবস্থাপনার সমস্যায় ভুগছিল। স্থানীয় প্রশাসন আশাবাদী যে, অতীতে যেমন তিনি অনেক দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে সফলতায় রূপ দিয়েছেন, তেমনি এই হাসপাতাল গুলোকেও নতুন প্রাণ দিতে পারবেন।
কালী প্রদীপ চৌধুরী উদ্যোক্তা মানসিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর জীবনকথা প্রমাণ করে যে, দূরদর্শিতা, কঠোর পরিশ্রম এবং অদম্য সংকল্প থাকলে সাধারণ শুরু থেকেও অসাধারণ সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। তাঁর এই যাত্রা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখাতে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে অনুপ্রেরণা জোগায়।
