ছাত্রদলের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে। শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। এ ঘটনায় অন্তত কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন গোবিপ্রবি ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক নাহিদ ইসলামসহ আরও অনেকে। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক গালিব ও সহসভাপতি রাকিবের নেতৃত্বে একটি পক্ষ নাহিদ ইসলামের ওপর হামলা চালায়। যদিও অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অপসারণ ও নতুন প্রক্টর নিয়োগকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা চলছিল। এর জের ধরেই শনিবার দুপুরে উভয় পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগামী ২৩ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পবিত্র রমজান উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত পবিত্র মাহে রমজান ও ঈদুল ফিতরের ছুটি বহাল থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
হঠাৎ এমন দীর্ঘ ছুটির ঘোষণায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, “এমনিতেই ক্যাম্পাস দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে। এ অবস্থায় আরও ছুটি যুক্ত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে কোর্স সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সেশনজটে পড়বে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে ছুটি কমানোর বিষয়টি ভাবা উচিত ছিল।”
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (আইআর) বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাবিব বলেন, “৫৪ দিনের ছুটিতে শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের সেশনজটে ভুগবে। শিক্ষক নিয়োগ জটিলতাসহ নানা কারণে শিক্ষার্থীরা আগেই হতাশাগ্রস্ত। দীর্ঘ ছুটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
এ বিষয়ে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন গোবিপ্রবির নেতা মোহাম্মদ হাবিব প্রশাসনের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “প্রশাসনের ব্যর্থ কার্যক্রমের তীব্র নিন্দা জানাই। ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ঝামেলা ও সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারাই প্রশাসনিক দক্ষতার প্রমাণ। বর্তমান প্রশাসন সেশনজট নিরসনে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের জীবনকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “আজকের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পেছনে বড় কারণ পূর্বের বিচারহীনতার সংস্কৃতি। প্রশাসন গদি টিকিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন সময় মারামারি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ‘সহমত ভাই’ তৈরি করেছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
আইন বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তুহিন বাদশা বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, অভিভাবকহীন পরিবার যেমন অগোছালো হয়ে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়টিও তেমন অগোছালো হয়ে পড়ছে। প্রশাসন থাকলেও তারা কার্যকরভাবে কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারছে না। প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব হলো পড়াশোনা ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করা। অথচ ছুটি বাড়ানোর সিদ্ধান্তে অনেকের ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত হয়ে গেছে। সেশনজট বাড়ছে—এই দায়ভার কে নেবে?”
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থীদেরও উচিত শিক্ষক রাজনীতির প্রভাব এড়িয়ে চলা এবং নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা।”
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
ক্যাম্পাসে বর্তমানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। শিক্ষার্থীরা দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন।
