বাংলাদেশে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দিয়েছেন, ‘মব কালচারের দিন শেষ’। তবে দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা বা মব সহিংসতা দমনে সরকার কতটা সফল হবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।
বিবিসি বাংলা-এর এক প্রতিবেদনে মানবাধিকার কর্মীদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় পুরো সময়জুড়েই ‘মব ভায়োলেন্স’ বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা ছিল আলোচনায়। কখনও নিরপরাধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা, কখনও চাঁদাবাজি, আবার কখনও ভিন্ন রাজনৈতিক মতের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি দলবদ্ধভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই দেশে ৪৬০ জন মব জাস্টিস ও গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্র-এর তথ্য বলছে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে মব জাস্টিস ও গণপিটুনিতে নিহত হন ২১৫ জন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বছর ২০২৪ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১২৮ জনে এবং ২০২৫ সালে প্রায় দুইশো।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেঙে পড়া আত্মবিশ্বাস এবং মব সহিংসতার বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের নমনীয় অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ‘মব ভায়োলেন্স বলতে কিছু নেই’ মন্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। অনেকের মতে, এতে অপরাধীদের এক ধরনের নীরব প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল।
‘তৌহিদী জনতা’সহ বিভিন্ন ব্যানারে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মব গঠনের ঘটনা ঘটে। ব্যক্তি আক্রমণের পাশাপাশি মাজার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হামলার অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক কট্টর গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার কথাও উঠে আসে।
এমন প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম কর্মদিবসেই সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সামনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, দাবি আদায়ের নামে আর মব কালচার চলবে না। তবে শান্তিপূর্ণ মিছিল-সমাবেশ ও স্মারকলিপি দেওয়ার অধিকার থাকবে।
মানবাধিকার সংগঠক নূর খান লিটন মনে করেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব। তবে দলীয় বিবেচনায় পক্ষপাতিত্ব করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হকও মনে করেন, বিচারের নামে ভিন্ন মত দমন বা নিজ দলের সমর্থকদের দায়মুক্তি দিলে মব সংস্কৃতি বন্ধ করা যাবে না।
নির্বাচনের পর রংপুরের পীরগঞ্জে সিলযুক্ত ব্যালট উদ্ধারের ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দলবদ্ধভাবে হেনস্তা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা নতুন সরকারের পথচলার শুরুতেই চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতির গতি ফেরানোর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করাই এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। মব সহিংসতা বন্ধে কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়া না গেলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে।
