নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের ত্রায়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খোলার নির্দেশনা দিয়েছেন দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
যদিও ১২ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনের পরে থেকেই স্ব-উদ্যোগে দলটির নেতাকর্মীরা বন্ধ থাকা কার্যালয় খুলতে শুরু করে।
সোমবার দলটির নেতাকর্মীদের প্রতি ব্যক্তিগত বার্তায় শেখ হাসিনা সরাসরি এ নির্দেশনা দিয়েছেন বলে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা চ্যানেল ১৪-কে নিশ্চিত করেছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, “আজ থেকে ধানমণ্ডি-৩২ নম্বরে সকলে যাবে, সকল জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগের অফিসে যাবে, ভাঙা-পোড়া হলেও সেখানে যেতে হবে। আজ থেকেই শুরু করতে হবে।”
তার এই বক্তব্যের পর বিভিন্ন জেলায় নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ে সমবেত হতে শুরু করেন। কোথাও জাতীয় পতাকা উত্তোলন, কোথাও দলীয় স্লোগান ও ছবি টাঙানোর কর্মসূচি পালন করা হয়।
তার এই আহ্বানের পর দেশের অন্তত ১০ জেলায় দলীয় কার্যালয়ে প্রবেশ, পতাকা উত্তোলন ও স্লোগান দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
তবে তিনটি জেলায়- দিনাজপুর, খুলনা ও চাঁদপুরে দলীয় কার্যালয়ে জামায়াত-সমর্থিত ছাত্র-জনতার ব্যানারে পুনরায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
দলীয় নেতাকর্মীরা বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-সমর্থিত জোট পরাজিত হওয়ার পর সারাদেশের গণতান্ত্রিক মহলে স্বস্তির কথা তুলে ধরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সাংগঠনিক কার্যক্রমে ফেরার উদ্যোগ নেন বলে দলীয় সূত্র দাবি করেছে।
পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, খুলনা, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কার্যালয় খুলতে শুরু হয়।
দিনাজপুরে স্লোগানের পর আগুন
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে দিনাজপুর শহরের বাসুনিয়াপট্টিস্থ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে কয়েকজন নেতাকর্মী প্রবেশ করেন। সেখানে তারা ‘জয় বাংলা, শেখ হাসিনার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। উপস্থিত নেতারা মোবাইল ফোনে সেলফি তোলেন এবং ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
ভাইরাল ভিডিওতে জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ খালেদ হাবিব সুমন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক রহমতুল্লাহ রহমত, জেলা সদস্য ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক সৈয়দ সালাহ উদ্দিন দিলীপ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য রুহানা নিশাত বিথী, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুল আলম, বীরগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক আরিফুজ্জামান, পাল্টাপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম ও সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকসহ আরও কয়েকজনকে দেখা যায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর থেকে দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগ ও কোতোয়ালি আওয়ামী লীগের কার্যালয় বন্ধ ছিল। প্রায় দেড় বছর পর সেখানে প্রবেশ করে স্লোগান দেওয়ার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়।
এর প্রতিবাদে বিকেল ৫টার দিকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি কার্যালয়ে প্রবেশ করে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন।
দিনাজপুর সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল হালিম জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও তাদের নজরে এসেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত এজাহারনামীয় আসামিদের গ্রেপ্তারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একই দিন বিকেলে বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়েও প্রবেশ করেন উপজেলা সদস্য ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রোকনুজ্জামান বিপ্লব, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মোনায়েম মিয়া, শতগ্রাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মোস্তফা, পাল্টাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক জিয়াউর রহমান জিয়াসহ অন্য নেতারা।
খুলনায় পতাকা উত্তোলনের পর ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ
খুলনা নগরীর শঙ্খ মার্কেট এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলে রোববার দুপুরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন নেতাকর্মীরা। শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙিয়ে তাতে মালা পরানো হয় এবং ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়া হয়।
পরে এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রাতে একদল ক্ষুব্ধ ছাত্র তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশ করে আসবাবপত্র ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কবির হোসেন জানান, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে কার্যালয় খোলার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
চাঁদপুরে পরিত্যক্ত কার্যালয়ে আগুন
চাঁদপুর শহরের কালীবাড়ি এলাকায় আওয়ামী লীগের একটি পরিত্যক্ত কার্যালয়ে মঙ্গলবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টার দিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় ৩০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চাঁদপুর উত্তর স্টেশনের ফায়ার লিডার নজরুল ইসলাম জানান, ভবনের দ্বিতীয় তলা ও ছাদে পরিত্যক্ত কাগজপত্র ও ময়লা-আবর্জনা জমে ছিল। দীর্ঘদিন ভবনটি পরিত্যক্ত থাকায় সেখানে বহিরাগতদের আনাগোনা ছিল এবং সিগারেটের আগুন থেকেই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়।
অন্যান্য জেলায় কার্যালয় খোলা
পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, চট্টগ্রাম, পটুয়াখালীসহ দেশের আরও কয়েকটি জেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ে প্রবেশ করেছেন। কোথাও পতাকা উত্তোলন, কোথাও সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
তবে আওয়ামী লীগ কার্যালয় খোলার পর কয়েকটি স্থানে জামায়াত-সমর্থিত ছাত্র-জনতার ব্যানারে পুনরায় আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
নির্বাচন-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দলীয় কার্যালয় খোলা ও তা ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, যেকোনো সহিংসতা, ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশনার পর মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়লেও পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সংঘর্ষের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক দলগুলোর পরবর্তী অবস্থানের ওপর।
