নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিবেচনায় হাজারো মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বিচারহীন অবস্থায় আটক অনেকেই নিয়মিত জামিন পাচ্ছেন না। সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৬–এ এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক সরকারের সময়ের গুম ও দমন–পীড়নের প্রবণতা অনেকাংশে কমেছে বলে ধারণা করা হলেও, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি করার চর্চা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে বহু রাজনৈতিক কর্মী, সমর্থক ও পেশাজীবী বিভিন্ন হত্যা ও সহিংসতার মামলায় আটক আছেন, যাদের অনেকেই বিচার শুরুর আগেই দীর্ঘদিন কারাগারে রয়েছেন।
এইচআরডব্লিউ জানায়, ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে এক অভিযানে কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো কঠোর আইন ব্যবহার করে আরও অনেকে আটক হয়েছেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহত হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাময়িক নিষিদ্ধের ফলে দলীয় সমাবেশ ও অনলাইন বক্তব্যের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে লেখক–সাহিত্যিকদের বিরুদ্ধে মামলা এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারা বহাল থাকায় সমালোচনার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে বলে মত দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারের প্রসঙ্গও এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সাবেক সরকারের আমলের গুরুতর অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও এর স্বচ্ছতা ও বিচারিক মান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গঠিত কমিশনের কার্যক্রমের কথাও বলা হয়েছে।
নারী ও সংখ্যালঘু অধিকার পরিস্থিতিও প্রতিবেদনে আলোচিত হয়েছে। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং নারী অধিকারসংক্রান্ত সংস্কার প্রস্তাব ঘিরে সামাজিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থী পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মিয়ানমারে সংঘাতের কারণে নতুন করে বহু রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া, ক্যাম্পে নিরাপত্তাহীনতা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় জীবনযাত্রার অবনতি এসব বিষয় প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের প্রসঙ্গে তরুণদের উচ্চ বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। বিশেষ করে পোশাকশিল্পে শ্রমিক অধিকার ও সুরক্ষা ঘাটতির বিষয়টি আলাদা করে তুলে ধরা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে একদিকে অতীতের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করা, অন্যদিকে বর্তমান সময়ে আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকার রক্ষা এই দুই চ্যালেঞ্জই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
