নিজস্ব প্রতিবেদক
মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে পরিকল্পিতভাবে ম্যানিপুলেটেড বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
তাদের মতে, এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে বর্জনের পথ বেছে নেওয়াই যুক্তিসংগত হবে বলে মত দিয়েছেন তারা।
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশো অনুষ্ঠানে সংবিধানের অন্যতম রচিয়তা ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের কন্যা ও বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর বলেন, প্রবাসীদের জন্য চালু করা পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাই একটি বড় ধরনের জালিয়াতির ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তার ভাষায়, “আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু বা অংশগ্রহণমূলক নয়। বরং পুরো প্রক্রিয়াটাই পরিকল্পিতভাবে ম্যানিপুলেট করা হচ্ছে।”
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ‘তৃতীয় মাত্রা’ টকশোর উপস্থাপক সাংবাদিক জিল্লুর রহমানও একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। দৈনিক প্রথম আলোকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি এখন পর্যন্ত আমার ফ্রেমের মধ্যে কোনো নির্বাচনই দেখছি না। নামে মাত্র নির্বাচনও দেখি না।”
তার মতে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সেটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি খারাপ নির্বাচনের নজির হয়ে থাকবে।
জিল্লুর রহমান বলেন, সরকারের ভেতরে এমন একটি শক্তি সক্রিয় রয়েছে, যারা আদতে নির্বাচন চায় না; চাইলেও তারা পক্ষপাতমূলক নির্বাচন চায়।
তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার খুব স্পষ্টভাবেই কিছু রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে কাজ করছে। পাশাপাশি সরকারের বাইরে একটি উগ্র গোষ্ঠী তৈরি করা হয়েছে, যারা সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই মাঠে সক্রিয় রয়েছে। এমনকি দেশের বাইরেও একটি শক্তি এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তার মতে, এই নির্বাচনকে কোনোভাবেই অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যায় না, কারণ আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্রদের একটি বড় অংশ নির্বাচনের বাইরে রয়েছে। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে যদি একটি ভালো নির্বাচন হতো, তবু আলোচনা করা যেত। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কেউ গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না।”
নির্বাচনী পরিবেশ প্রসঙ্গে জিল্লুর রহমান আরও বলেন, মাঠপর্যায়ে কোনো নির্বাচনী আমেজ নেই। সরকারি প্রচারণা ছাড়া অন্য কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ছে না, যা মূলত গণভোটের প্রস্তুতির মতো বলেই তার কাছে মনে হয়েছে।
তানিয়া আমীর বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই স্পষ্টভাবে গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অথচ বর্তমান সরকার নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি সরাসরি বিএনপির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। এ ধরনের বাস্তবতায় বিএনপির জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, বিএনপির উচিত এই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো।
ব্যারিস্টার তানিয়া আমীরের এই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে মতামত প্রকাশ করছেন।
এদিকে বিএনপির পক্ষ থেকেও প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ভোটার হস্তান্তর ও নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগ তোলা হয়েছে। দলটির দাবি, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নাগরিক সমাজের একাংশ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল প্রশ্নবিদ্ধই নয়, বরং এটি একটি পূর্বনির্ধারিত ও ম্যানিপুলেটেড প্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির নির্বাচন বর্জনের পরামর্শ নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
