নিজস্ব প্রতিবেদক
বর্তমান সরকারের নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ী সমাজ উপেক্ষিত—এমন অভিযোগ তুলে সরকারকে ‘এনজিওদের সরকার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের এই দাবির সঙ্গে প্রকাশ্যে সহমত পোষণ করেছেন সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদও।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি)রাজধানীর কাওরানবাজারে এনএলআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ম্যাক্রোইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস ফর নিউ গভর্নমেন্ট’ শীর্ষক সেমিনারে এই বক্তব্য উঠে আসে।
এ সেমিনারে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতি সংশ্লিষ্টদের সামনে সরকারের নীতিগত অবস্থান নিয়ে খোলামেলা সমালোচনা হয়।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার কোনো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের মতামত নেয়নি।
তিনি বলেন, “এই সরকার এনজিও থেকে আসা লোকজন দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে তারা এনজিওগুলোর মাধ্যমেই পুরো দেশ চালানোর চেষ্টা করছে।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, দেশে আদৌ কোনো কার্যকর রিফর্ম হয়েছে কি না।
ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে আজম জে চৌধুরী বলেন, পণ্য আমদানির পর এক দিনের মধ্যে খালাস পাওয়ার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয় না। অনেক ক্ষেত্রে আমদানিকৃত পণ্যের শ্রেণি নির্ধারণে জটিলতা তৈরি করে সেগুলো বুয়েটে পাঠানো হয়, যার ফলে এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত পণ্য খালাস আটকে থাকে। তিনি বলেন, “ম্যাক্রো লেভেলে নীতি নিয়ে কথা বলা সহজ, কিন্তু অর্থনীতির অপারেশনাল কাজগুলো হয় মাইক্রো লেভেলে। সেখানে কোনো রিফর্ম হয়নি।”
ভূমি প্রশাসনেও দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগ করে তিনি বলেন, জমির মিউটেশন করতে গিয়ে ডিসি অফিসসহ বিভিন্ন দপ্তরে ব্যাপক ভোগান্তি ও চাঁদাবাজির শিকার হতে হয়। আগে যেখানে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা দিতে হতো, সেখানে এখন ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ব্যবসায়ী নেতাদের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, সরকার এনজিও মডেলে চলছে নাকি রাজনৈতিক সরকারের মতো কাজ করছে—তা নিয়েই তিনি নিজেও দ্বিধায় আছেন। “আমরা আসলে কী ধরনের সরকার, সেটাই এখনো স্পষ্ট নয়,”—বলেন তিনি।
তবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা আশাবাদও প্রকাশ করেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থান না হলে ব্যাংকিং খাতে ধস নামতে পারত এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও কমে যেত, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের স্থিতিশীলতা বিপন্ন করত। তার মতে, বর্তমানে অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়ছে, শিল্প খাতে কাঁচামালের ব্যবহার বাড়ছে এবং বৈদেশিক লেনদেন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে একই সঙ্গে অনিশ্চয়তাও রয়ে গেছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন, ব্র্যাক ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবদুল মোমেন, ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামালউদ্দিন জসিম, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামসুল ইসলাম, ইআরএফের সাবেক সভাপতি শামসুল হক জাহিদ এবং ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও মো. কাজিম উদ্দিন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নীতি প্রণয়নে ব্যবসায়ী সমাজের এই ধরনের প্রকাশ্য অসন্তোষ এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন উপদেষ্টার প্রকাশ্য সহমত বর্তমান শাসনব্যবস্থার নীতিগত দিকনির্দেশনা ও অংশীজন সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
