নিভৃত কুহক
১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ একযোগে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। কিন্তু এই নির্বাচন শুধু নতুন সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও গভীর ও মৌলিক একটি উদ্বেগ—রাষ্ট্রক্ষমতার ভিত্তি কি সংবিধান ও আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, নাকি দেশ পরিচালিত হবে মবের সহিংস শক্তিতে?
এই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ, যা ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট সহিংস আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে। সনদে ওই আন্দোলনের সময় সংঘটিত কর্মকাণ্ডের জন্য আইনি দায়মুক্তির (indemnity) স্পষ্ট উল্লেখ থাকায় তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতন
২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই রূপ নেয় সরকারবিরোধী আন্দোলনে। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা হারায়।
তবে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল চরম সহিংসতার ধারাবাহিকতা। আন্দোলনের একাধিক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতার সহিংস আচরণ দৃশ্যমান ছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যে উঠে আসে—পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পিটিয়ে হত্যার ঘটনা, ওভারব্রিজে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা, পুলিশ স্টেশনের ভেতরে কর্মকর্তাদের আটকে অগ্নিসংযোগ, থানার অস্ত্র লুট, এবং আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সংখ্যালঘু মত ও সম্প্রদায়ের ওপর হামলা।
সরকার পতনের পরও থামেনি সহিংসতা
৫ আগস্টের পর সহিংসতা কমার পরিবর্তে নতুন মাত্রা পায়। বিভিন্ন সময় মব করে ডজনখানেক মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কবর থেকে মরদেহ তুলে পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। আছে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে জীবিত মানুষকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা। শহরে, নগরে, পাড়ায়, মহল্লায়, রাস্তায়, গলিতে গুলি করে মানুষ হত্যা। আছে বিভিন্ন পেশাজীবীর ওপর হামলা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে সহিংস আচরণ ছিল একটি ধারাবাহিক প্রবণতা, সাময়িক কোন বিশৃঙ্খলা নয়।
দীর্ঘদিনের প্রবণতা, নতুন মাত্রা
বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দেন, বাংলাদেশে মব আচরণ নতুন নয়। ২০১৫ সালের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, ২০১৮ সালের সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলন, আগের কোটা আন্দোলনগুলোতেও পুলিশ ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। মানুষকে কানে ধরে উঠ-বস করানো হয়েছে সড়ক নিরাপদ আন্দোলনের সময়। কালো কালি মেখে দেওয়া হয়েছে।
জুলাই ২০২৪-এ এই সহিংস জনতাই সরকার পরিবর্তনের নিয়ামক হয়ে ওঠে, এবং পরবর্তীতে সেই প্রক্রিয়াকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জুলাই সনদ ও দায়মুক্তির প্রশ্ন
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুলাই জাতীয় সনদে আন্দোলনকালীন কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তির বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
তাঁদের মতে, বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া দায়মুক্তি দেওয়া হলে তা মানুষকে কী যে বার্তা দেয় সেটি হলো—রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত হলে সহিংসতা ক্ষমাযোগ্য। মানবাধিকারকর্মীরা সতর্ক করছেন, এতে ভবিষ্যতে এক সহিংস রাজনীতির পথ তৈরি হবে বাংলাদেশে।
গণভোটের প্রশ্ন ও কাঠামো
১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে ভোটারদের একটি মাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে হবে। প্রশ্নটি চারটি ধারায় বিভক্ত, যার মধ্যে রয়েছে—
- নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠন
- দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও উচ্চকক্ষ গঠন
- প্রধানমন্ত্রী মেয়াদ সীমা, নারী প্রতিনিধিত্ব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ ৩০টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা
- সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার বাস্তবায়ন
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে।
গণভোট: সংস্কার না বৈধতা?
সমালোচকদের মতে, একটি মাত্র প্রশ্নে এত বিস্তৃত বিষয় যুক্ত হওয়ায় ভোটাররা সংস্কার ও সহিংসতার বৈধতা—এই দুই বিষয় আলাদা করে বিবেচনার সুযোগ পাচ্ছেন না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হতে পারে—যেখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সহিংস রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
মব রাজনীতির ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ এখন একধরণের ‘মব রাষ্ট্র’। যদিও আদালত চলছে, নির্বাচন হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় কাঠামো কার্যকর আছে। তবে, সবকিছুর চেয়ে শক্তিশালী এই মব যা কখনও ‘আন্দোলকারী’, কখনও ‘উত্তেজিত জনতা’ আবার কখনও ‘তৌহিদী জনতা’ নামে ঘটিয়ে যাচ্ছে একের পর এক ভয়াবহ ফৌজদারি অপরাধ। এমন অবস্থায় দায়মুক্তি, সহিংসতার বিচারহীনতা ও সাংবিধানিক বৈধতা একত্র হলে ধীরে ধীরে আইনের শাসন ক্ষয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি সন্ধিক্ষণ মুহূর্ত। প্রশ্ন শুধু কে ক্ষমতায় আসবে তা নয়; প্রশ্ন হলো—ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইনের মাধ্যমে, না মবের মাধ্যমে।
