ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, স্থবির মজুরি, কর্মসংস্থানের সংকট ও ব্যাংকিং খাতের ভয়াবহ অবস্থায় দেশের অর্থনীতি এখন গভীর চাপে রয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিললেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন নেই।
চাল, ভোজ্য তেল, শাকসবজি, পরিবহন, বাড়িভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় আয়ের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে মজুরিভিত্তিক শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় জীবনযাত্রা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
সরকারি হিসাবে ২০২৫ সালের নভেম্বরে গড় মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। তবে একই সময়ে মজুরি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ০৪ শতাংশে। ফলে মূল্যস্ফীতি কমলেও সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেয়। এর ফলে বৈদেশিক খাতে আংশিক স্বস্তি ফিরেছে। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারে, যা এক বছর আগে ছিল ১৯ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার।
রপ্তানি, আমদানি ও প্রবাসী আয় বাড়লেও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে এর প্রভাব পড়েনি। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ২০২৫ সালের অক্টোবরে নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে, যা রেকর্ড সর্বনিম্ন।
কর্মসংস্থানের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। আনুষ্ঠানিক খাতে নতুন চাকরি সৃষ্টি ধীরগতির, আর অনানুষ্ঠানিক ও অস্থায়ী কাজ বাড়ছে। ১৫–২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ২০ শতাংশের বেশি বর্তমানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে, যা ভবিষ্যতে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে উঠে আসছে ব্যাংকিং খাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৪৪ লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সরকার পরিবর্তনের আগে এই হার ছিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, উচ্চ সুদ, করের চাপ ও ঋণপ্রাপ্তির জটিলতায় নতুন বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসা সম্প্রসারণ বা নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগ্রহ নেই বললেই চলে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিনিয়োগ না হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান দুটোই ব্যাহত হবে। এতে সরকারের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিসংখ্যানের কিছু উন্নতি সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি, মজুরি স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সংকট ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতায় দেশের অর্থনীতি এখনো গভীর সংকটেই রয়েছে। টেকসই উত্তরণের জন্য জরুরি কাঠামোগত সংস্কার, সুশাসন এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে আস্থা ফিরিয়ে আনা।
